করোনায় রাজনীতির হালচাল: ভাষ্য কী বিএনপির

এস এম আতিক হাসান
২৪ এপ্রিল ২০২০, শুক্রবার
প্রকাশিত: ১১:৩৩ আপডেট: ০৫:০৯

করোনায় রাজনীতির হালচাল: ভাষ্য কী বিএনপির

একুশ শতকের তথ্য-প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবীতে মানুষের জীবনযাত্রার গতি বহুগুণে বেড়ে গেছে। মানুষ এখন সময়ের আগে চলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। প্রযুক্তি দুনিয়া মানুষের হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে বিশ্বটাকে। নিমেষেই দেখে নেয়া যায় কেমন আছে মনুষ্যের এই গ্রহটি। কেমন আছে গ্রহের মানুষগুলো। এরই ধারাবাহিকতায় এ মুহূর্তে মানুষ নিশ্চিতভাবেই জেনে গেছে, বিশ্বটা এখন খাঁচায় বন্দি। বিশ্বটা এখন মৃত্যুর উপত্যকা। কোনও এক অদৃশ্য শক্তির বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে তামাম দুনিয়া নাস্তানাবুদ হয়ে পড়েছে। কেউ কিচ্ছুটি করতে পারছে না। সব যেন সাধ্যাতীত। অথচ কোথায় গেল আজ এত এত শক্তির পসরা। কোথায় আজ বিশ্বনেতাদের মোড়লিপড়া। কোথাও কিছু নেই। সব পরাশক্তি আজ বিমূর্ত এক মহাশক্তির সামনে পরাভূত, পরাস্ত, পরাজিত। আর সেই মহাশক্তির নাম ‘করোনা ভাইরাস’।

গত প্রায় ৪ মাসে কোটি কোটি মানুষের ঘুম কেড়ে নিয়েছে প্রাণঘাতি এই ভাইরাস। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই হানা দিয়েছে ভাইরাসটি। গোটা বিশ্বে ২৭ লাখের মতো আক্রান্ত, মৃত্যু ছুঁয়েছে ২ লাখের কাছাকাছি। সব দেশে সব রাষ্ট্রপ্রধান ও রাজনৈতিক দলগুলোই করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে। যে পৃথিবী সকাল হলেই দেশীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির নানা খবর নিয়ে হাজির হতো সেই পৃথিবীতে রাজনীতি এখন বিপুপ্ত প্রায়! জীবন বাঁচানোই যেখানে দায় হয়ে পড়েছে সেখানে রাজনীতির সুযোগ কোথায়? করোনা ভাইরাস অর্থনীতির পাশাপাশি রাজনৈতিক আঙিনায়ও মন্দা ডেকে এনেছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিটা অনেকটাই এরকম যে, এখানে বিরোধীপক্ষগুলোর মধ্যে সম্প্রীতির মনোভাব প্রায় পুরোপুরিই অনুপস্থিত। সেটা হোক ক্ষমতাসীন দল কিংবা বিরোধীদল- পক্ষশক্তিগুলো বিপক্ষশক্তিকে যতটা পারা যায় যতভাবে পারা যায় ঘায়েল করে রাখতে চায়। হয় কথায় নয় বলপ্রয়োগে! স্বাধীনতা পরবর্তী গত সাড়ে ৪ দশকে বাংলাদেশের রাজনীতি ঠিক এমন বৈরিতাপূর্ণ পথেই নানা চড়াই উৎরাই মাড়িয়ে অগ্রসর হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা এই যে, কোনও একদিনের জন্যও কোনও পক্ষকে কেউ কথার মারপ্যাঁচ থেকে দমাতে পারেনি।

প্রায় প্রতিদিনই সংবাদ সম্মেলন চলে, প্রতিদিনই মিডিয়ার লাইট ফোকাস, প্রতিদিনই খবরের পাতার প্রধান শিরোনামে থাকে রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের নানা রসালো, ঝাঝালো, আক্রমণাত্মক বক্তব্য-বিবৃতি। কিন্তু বাংলাদেশের পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত মাস দেড়েকে দেশের রাজনীতিকরা অনেকটা চুপ মেরে গেছেন। কেউ তেমন একটা কথা বলছেন না। বিরোধীপক্ষকে নিয়েও মাথা ঘামাচ্ছেন না নেতারা। করোনা ভাইরাসের এই মহাবিপর্যয়ের কালে গৃহবন্দি নেতারা বক্তব্য, বক্রোক্তি, ব্যাঙ্গোক্তিতেও যেন অনেকটাই চুপসে গেছেন। 

তবে পরিস্থিতি পাল্টালেও রাজনীতিতে যে একেবারে নেই তা নয়। এখন সব দলের সামনেই রাজনীতির মূল এজেন্ডা করোনা ভাইরাস। সরকারি দল যেমন বিরোধী দলগুলোর ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে, আবার বিরোধীদলগুলো করোনা মোকাবিলায় সরকারের নানা ভুলভ্রান্তি ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা না করার বিষয়গুলোকে জনগণের সামনে তুলে ধরছে। এতে করে করোনা ইস্যু নিয়ে বড় বড় দলগুলোর বড় বড় নেতাদের মধ্যে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া কমবেশি লেগেই আছে। 

দেশের শীর্ষ অনলাইন নিউজ পোর্টাল ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি দেশের চলমান করোনা পরিস্থিতিতে ‘রাজনীতির হালচাল’ নিয়ে শীর্ষ দলগুলোর উপলব্ধি তুলে আনার চেষ্টা করেছে। আর সে কাজটি করতে গিয়ে দেখা গেছে, সব দলই এখন মনে করছে আগে মানুষের সুরক্ষা। সবাইকে সুরক্ষিত রাখতে পারাই এখন বড় কাজ। রাজনীতি যেহেতু মানুষের জন্য তাই এই দুর্যোগকালীন সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো মানুষকে নিরাপদে রাখা ও সহায়তা করার চেয়ে বড় কাজ আর কিছু হতে পারে না। আর সেটা যতটা সম্ভব ঐক্যবদ্ধ হয়ে করারও তাগিদ আছে দলগুলোর। বলা হচ্ছে জাতীয় ঐক্যের কথাও। 

করোনায় কী হাল দেশের রাজনীতির, কী বলছেন দেশের অন্যতম বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তি বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ- এ নিয়েই তৈরি করা হয়েছে প্রতিবেদনটি। দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে ফোনালাপে তাদের অভিব্যক্তি তুলে এনেছেন ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি-এর স্টাফ করেসপন্ডেন্ট এস এম আতিক হাসান

বৈশ্বিক দুর্যোগ করোনা ভাইরাস মোকাবিলায়ও সরকার এককভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে অভিযোগ করে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ব্রেকিংনিউজকে বলেন, ‘সবার আগে মানুষের জীবন, সেটাকে রক্ষা করবার জন্য সরকারকে দায় দায়িত্ব নিতে হবে। যে কারণে আমরা জাতীয় ঐক্যের কথা বলেছি। জাতীয় টাস্কফোর্স গঠনের কথা বলেছি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেটা তো হচ্ছে না। এককভাবে সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে সরকার। সিদ্ধান্তটা যতক্ষণ পর্যন্ত জনগণের পক্ষে থাকবে ঠিক আছে।’ 

কবে নাগাদ দেশের লকডাউন তোলা উচিত- এ প্রসঙ্গে ফখরুল বলেন, ‘এখনই এই মুহূর্তে আমার পক্ষে বলা সম্ভব না। কারণ লকডাউনটা কেন করা হয়েছে সেটা আমাদেরকে বুঝতে হবে। লকডাউনটা করা হয়েছে কারণ অন্য কোনও ট্রিটমেন্ট নেই। যেহেতু এটার কোনও চিকিৎসা বের হয়নি, এখন পর্যন্ত এর কোনও ভ্যাকসিন বের হয়নি তাই লকডাউনই নিরাপদ থাকার প্রধান কৌশল। দেখা যাচ্ছে এটা একটা অত্যন্ত ভয়াবহ রকমের ছোঁয়াচে অসুখ। যেটা মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে সারা পৃথিবীব্যাপি।’

তিনি বলেন, ‘এ অবস্থায় যদি ফিজিক্যাল ডিসটেন্স থাকে তাহলে কিছুটা রক্ষা পাওয়া যেতে পারে। এ কারণেই গোটা পৃথিবীতে আজকে লকডাউন এসেছে। এখন কোন সময়ে এটা তোলা যেতে পারে অথবা কোন সময় এটা তোলা যেতে পারে না বিশেষজ্ঞরা আছেন, তারা বলবেন। অন্যদিকে ইকোনোমির যে অবস্থা সে দিকেও খেয়াল রাখতে হবে। সব মিলিয়েই সিদ্ধান্তটা নিতে হবে। সুতরাং মুহূর্তের মধ্যে এটা বলে ফেলা সম্ভব নয়। বাংলাদেশে তো দিন দিনই করোনার প্রাদুর্ভাব বিস্তার লাভ করছে। ফলে বিষয়টি কর্তৃপক্ষ আরও চিন্তা করবে। পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত দেবে। কিন্তু মানুষের জীবন তো সবার আগে, তাই নয় কি?’

মহামারি করোনা পরিস্থিতিতে দেশের রাজনীতিতে এক ধরনের স্থবির অবস্থা চলছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী বরকত উল্লাহ বুলু ব্রেকিংনিউজকে বলেন, ‘করোনা ভাইরাস হলো সারা পৃথিবীর একটা মহামারি। এই সময়ে এখন রাজনীতি মানেই হলো মানুষের পাশে দাঁড়ানো। যারা কর্মজীবী মানুষ দিন আনে দিন খায় তারা এখন অনেকেই কর্মহীন হয়ে আছে এবং কিছু কিছু নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার আছে যারা কারও কাছে হাত পাততে পারছেন না, তাদের অনেকেই এখন খাদ্যাভাবে চিকিৎসার অভাবে দুরবস্থার মধ্যে আছে। এই করোনার সময় রাজনীতির চেয়ে বড় বিষয় হলো মানবিক বিষয়। একটা হার্টের রোগী, কিডনি সমস্যার রোগী, নরমাল জ্বড়ের রোগী হাসপাতালে কোথাও চিকিৎসা পাচ্ছে না, বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছে।’

ডাক্তার এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে মানবিক হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘করোনা রোগ ছাড়াও বিভিন্ন রোগে যারা আক্রান্ত হচ্ছেন তাদেরকে যেন সঠিক চিকিৎসা দেয়া হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিৎ এখন যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষের পাশে দাঁড়ানো। বিএনপি প্রায় ১৩-১৪ বছর ক্ষমতার বাইরে। বিভিন্ন মামলা, হামলার শিকার দলটির নেতাকর্মীরা নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। বিএনপির নেতাকর্মীদের জন্য কোনও ব্যাংক ফ্যাসিলিটিজও নাই, কোথাও টেন্ডার দিতে পারে না। এমন অবস্থার মধ্যেও বিএনপির সকল নেতাকর্মীরা মানুষের পাশে সাধ্যমত দাঁড়াচ্ছে।’

দলটির আরেক ভাইস-চেয়ারম্যান ও কৃষকদলের আহ্বায়ক শামসুজ্জামান দুদু ব্রেকিংনিউজকে বলেন, ‘শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা পৃথিবীই আজ ভয়াবহ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এরকম মহামারি পরিস্থিতি এর আগেও পৃথিবীতে এসেছে। কিন্তু এবারের শত্রুই অদৃশ্য। এই ভাইরাসটির কোনও ওষুধ নাই, ভ্যাকসিন নাই, চিকিৎসা নাই। আমাদের দেশটা অত্যন্ত গরিব। যে যাই দাবি করুক না কেন, উন্নত বিশ্বে আমরা ঢুকে পড়েছি সেটি কতটা সত্য এখন তা প্রমাণ হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘রাজনীতির প্রধান বিষয় হচ্ছে মানবসেবা, দেশসেবা। মানুষের পাশে দাঁড়ানোই এখন সবচেয়ে বড় রাজনীতি। সরকার এবং সকল রাজনৈতিক দল যদি ঐক্যবদ্ধভাবে এই মহাবিপদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে তাহলে এর থেকে পরিত্রাণ পেতে পারি। সেজন্য এখন কাজ হচ্ছে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে এগিয়ে যাওয়া এবং করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয় ছিনিয়ে আনা।’ 

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব ও দলটির মুখপাত্র অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী ব্রেকিংনিউজকে বলেন, ‘রাজনীতি তো মানুষের জন্য, দেশের এমন পরিস্থিতিতে হয়তো আমাদের সাংগঠনিক তৎপরতা চালানোর সুযোগ নেই। কিন্তু আমরা মহামারি করোনা ভাইরাসের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সাধ্যমতো চেষ্টা করছি। এটাও তো রাজনীতির মধ্যেই পড়ে। মানুষ মানুষের জন্য। এটা আমাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে।’

যুগ্ম-মহাসচিব অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, ‘আমার তো মনে হয় মানবতার পক্ষে কাজ করাই এখন বড় দায়িত্ব। ‘মানুষ মানুষের জন্য’ এটাই এখন প্রতিপাদ্য হওয়াই উচিত। এই মুহূর্তে যে যার মতো ব্যক্তিগতভাবে, রাজনৈতিকভাবে কিংবা যেকোনও অবস্থান থেকে যৌথভাবে মানুষদের পাশে দাঁড়ানো এবং সার্বিক সহযোগিতায় এগিয়ে আসার জন্য যা যা করণীয় প্রত্যেকে নিজের অঙ্গন থেকে করা উচিত। যা কিনা এই পরিস্থিতিতে ‘সব রাজনীতির ঊর্ধ্বে বড় রাজনীতি’ বলে আমি মনে করি। সেটাই এখন সবার করা উচিত।’

ব্রেকিংনিউজ/এএইচ/এমআর

bnbd-ads