আঁধারেই অন্ধকারের প্রতিবাদ!

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
৬ অক্টোবর ২০২০, মঙ্গলবার
প্রকাশিত: ০৭:৫০ আপডেট: ০৩:৩৯

আঁধারেই অন্ধকারের প্রতিবাদ!

দিন দিন অন্ধকার বাড়ছে। আলোহীন হয়ে পড়ছে সমাজটা। চারদিকে নারীর প্রতি সহিংসতার মাত্রা বেড়েই চলছে। ধর্ষিতার ‘আব্বা গো তোর আল্লাহর দোহাই ছাড়ি দে’ চিৎকারে সব আলো নিমিষেই নিভে গেল। অন্ধকারে নিমিজ্জিত সমাজকে আলোতে বাঁচার জোঁ নেই। তাই আঁধারের প্রতিবাদ আঁধারে ডুবেই। 

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে সম্ভ্রম হারানো নারীর জন্য কাঁদছে দেশ, কাঁদছে মানুষ। সভ্যতার এমন লগ্নে এ কেমন বর্বরতা! এ কেমন পাশবিকতা! আর ধর্ষণের ঘটনা চাপা পড়ছে, আরেকটি ধর্ষণ দিয়ে। তাও আবার বর্বরতার ভিন্ন ভিন্ন রূপে।

ধর্ষিতার হাহাকারে ভারি হচ্ছে বাতাস। মানুষ এ থেকে মুক্তি চায়। রাজপথেও প্রতিবাদও যেখানে অকার্যকর। সেখানে প্রতিবাদের ভাষা পাল্টাতেও বাধ্য। 

পাল্টে যাওয়া প্রতিবাদে যোগ হয়েছে ‘অন্ধকার’ বা ‘কালো চিহৃ’। যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল। নোয়াখালী বেগমগঞ্জের নির্যাতিত নারীর পাশে দাঁড়িয়েছে মানুষ শোকের প্রতীক ‘কালো’ ধারণ করে। 

প্রতিবাদের ভাষা পাল্টে এমন অভিনব পদ্ধতিতেও আসবে কি আলো? সে প্রশ্ন ভবিষ্যতের কাছে তোলা থাক। মানুষ প্রতিবাদের ভাষা বদলে, সমাজও বদল চায়। 

গত সোমবার রাত থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কালো প্রতীকটি ব্যবহার করে অনেকে ধর্ষণের প্রতিবাদ করতে থাকে। একদিনের ব্যবধানেই অভিনব এই প্রতিবাদের প্রতীক ভাইরাল হতে দেখা যায়। অনেকে তার ফেসবুকে ওয়ালে প্রতীকটি ব্যবহার করেন। অনেকেই আবার প্রোফাইল করেন।

ইডেনের কলেজের এক ছাত্রী উম্মে সালমা তার ফেসবুক ওয়ালে কালো প্রতীক ব্যবহার করে ধর্ষণের প্রতিবাদ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, সমাজ অন্ধকারে ডুবে গেছে। প্রতিবাদের ভাষাও হারিয়ে ফেলেছি। তাই বলে তো আর বসে থাকার সুযোগ নেই। প্রতিবাদের ভাষা বদলে, সমাজ বদলের স্বপ্ন দেখছি। আজ বাইরে কিংবা ঘরে সবখানেই মেয়েরা অনিরাপদ। 

ইডেন কলেজের আরেক ছাত্রী মাহমুদা খানম জানান, নারীরা সব জায়গাতেই নির্যাতিত হচ্ছে। এই নির্যাতনের মাত্রা প্রতি নিয়ত বাড়ছে। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। নারীরা কোথাও নিরাপদ নই। এখনই সময় ধর্ষকদের প্রতিরোধ করার। ভার্চুয়াল জগত বর্তমান সমাজে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি যোগাযোগ মাধ্যম। এখানেও নারীরা নিরাপদ নয়, তাই সব জায়গাতেই প্রতিবাদ হওয়া দরকার। তাই অন্যসব স্থানের মত ফেসবুকেও প্রতিবাদ করতে হবে। আর ধর্ষকদের বলতে হবে, আর নয়-এবার থামো।

পাহাড়-সমতলে সব জায়গাতেই নারী ধর্ষিত হচ্ছে তাই আঁধারে ডুবেই আলো ফিরিয়ে আনার প্রতিবাদ করছি জানিয়ে তিতুমীর কলেজের শিক্ষা তাসনিম খানম রাইসা জানান, সমাজে আলো ফিরেয়ে আনতে প্রতিবাদের বিকল্প নেই। তাই অন্ধকার দিয়েই অন্ধকার দূর করতে চাই। 

উল্লেখ্য, গত ২ সেপ্টেম্বর নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার একলাশপুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডে এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার ৩২ দিন পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর রবিবার (৪ অক্টোবর) বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। এ ঘটনায় মামলা করা হয়েছে। এ পর্যন্ত চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২ সেপ্টেম্বর রাত ৯টার দিকে একলাশপুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের খালপাড় এলাকার নূর ইসলাম মিয়ার বাড়িতে গৃহবধূর বসতঘরে ঢুকে তার স্বামীকে পাশের কক্ষে বেঁধে রাখে স্থানীয় বাদল ও তার সহযোগীরা।

এরপর গৃহবধূকে ধর্ষণের চেষ্টা করে তারা। এ সময় গৃহবধূ বাধা দিলে তাকে বিবস্ত্র করে বেধড়ক মারধর করে তারা মোবাইলে ভিডিওচিত্র ধারণ করে।

এদিকে এ ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়েপড়া ভিডিওটি অনলাইন মাধ্যম থেকে সরিয়ে নিতে বিটিআরসিকে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। বলা হয়েছে, একটি ভিডিওর কপি সংরক্ষণে রাখতে। ২৮ অক্টোবর এ বিষয়ে প্রতিবেদন জমা দেবেন বেগমগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)।

একই সঙ্গে ভিকটিমের পরিবারকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দিতে স্থানীয় পুলিশ সুপারকে (এসপি) নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ঘটনা তদন্তের জন্য সেখানকার স্থানীয় সরকারি কলেজের প্রিন্সিপাল, সমাজসেবা অফিসারসহ তিনজনের নেতৃত্বে কমিটি গঠন করতে বলা হয়েছে। অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনারকে (এডিসি) এ বিষয়ে ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতেও নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

নোয়াখালীতে গৃহবধূকে নির্যাতনসহ সারাদেশে সংঘটিত ধর্ষণ-নিপীড়নের ঘটনায় বিচারের দাবিতে রাজধানীর শাহবাগ মোড় অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে সম্মিলিত ছাত্র-জনতা। রাজধানীর উত্তরা ও নারায়ণগঞ্জে বিক্ষোভ কর্মসূচির খবর পাওয়া গেছে।

ব্রেকিংনিউজ/এএফকে 

bnbd-ads