চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী কয়েকটি মসজিদ

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
২৩ মে ২০২০, শনিবার
প্রকাশিত: ০৩:৩২ আপডেট: ০৩:৩৩

চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী কয়েকটি মসজিদ

চট্টগ্রাম ঐতিহাসিক নাম ইসলামাবাদ। বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। বন্দরনগরী নামে পরিচিত শহর, দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম জেলায় অবস্থিত। বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত। পাহাড়, সমুদ্রে এবং উপত্যকায় ঘেরা চট্টগ্রাম শহর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যে প্রাচ্যের রাণী হিসেবে বিখ্যাত। বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামের ইতিহাস বেশ পুরনো। প্রাচীন ইতিহাস ঐতিহ্যের মধ্যে এই অঞ্চলের বেশ কয়েকটি মসজিদ উল্লেখযোগ্য। দর্শনীয় ও কালের সাক্ষী এমন কয়েকটি মসজিদ পরিচিতি ব্রেকিংনিউজজের পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো-

আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ

চট্টগ্রামের চাটগছার আন্দরকিল্লার সাথে মোঘলদের চট্টগ্রাম বিজয়ের কাহিনী সম্পর্কিত। এই কিল্লা বা কেল্লায় মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের আস্তানা ছিলো। চট্টগ্রাম বিজয়ের স্মৃতি ধরে রাখতে সম্রাট আওরঙ্গজেবের নির্দেশে শায়েস্তা খাঁ ১৬৬৭ খ্রিষ্টাব্দে এখানে নির্মাণ করেন আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ।

জানা যায়, ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দের ২৭ জানুয়ারি চট্টগ্রামের তৎকালীন মোগল শাসনকর্তা সুবেদার নবাব শায়েস্তা খাঁর পুত্র উমেদ খাঁ মগ ও পর্তুগিজদের একটি আস্তানার অভ্যন্তরে প্রবেশ করলে এর নামকরণ করা হয় ‘আন্দরকিল্লা’।

যুদ্ধ বিজয়ের স্মারক হিসেবে দিল্লির সম্রাট আওরঙ্গজেব চট্টগ্রামের নতুন নামকরণ করেন ইসলামাবাদ। তারই নির্দেশে চট্টগ্রাম বিজয়ের মোগল স্মারক চিহ্ন হিসেবে শায়েস্তা খাঁ ১৬৬৭ সালে ‘আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ’ নির্মাণ করেন। দিল্লি’র এক ঐতিহাসিক জামে মসজিদের অবয়বে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়।

সমতল ভূমি থেকে প্রায় ত্রিশ ফুট ওপরে ছোট্ট পাহাড়ের ওপর মসজিদটির অবস্থান। মূল মসজিদের নকশা অনুযায়ী, আন্দরকিল্লা শাহী মসজিদ ১৮ গজ (১৬ মিটার) দীর্ঘ, ৭ দশমিক ৫ গজ প্রস্থ। প্রতিটি দেয়াল প্রায় ২ দশমিক ৫ গজ পুরু। পশ্চিমের দেয়াল পোড়া মাটি এবং বাকি তিনটি দেয়াল পাথর দিয়ে তৈরি। মধ্যস্থলে একটি বড় এবং দুটি ছোট গম্বুজ দ্বারা ছাদ আবৃত। ১৬৬৬ সালে নির্মিত মসজিদের চারটি অষ্টভুজাকৃতির গম্বুজগুলোর মধ্যে পেছন দিকের দুটি এখনো বিদ্যমান রয়েছে। মসজিদটির পূর্বে তিনটি, উত্তর এবং দক্ষিণে একটি করে মোট ৫টি প্রবেশদ্বার রয়েছে। মসজিদটিতে তিনটি মেহরাব থাকলেও সাধারণত মাঝের সর্ববৃহৎ মেহরাবটিই বর্তমানে ব্যবহৃত হচ্ছে।

আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ নির্মাণের প্রায় ৫৬ বছর পর অর্থাৎ ১৭২৩ খ্রিস্টাব্দে আরেক শাসনকর্তা নবাব ইয়াসিন খাঁ মসজিদের সন্নিকটের পাদদেশের দক্ষিণ-পূর্ব দিকের একটি টিলার ওপর আরেকটি পাকা মসজিদ নির্মাণ করেন। যার নামকরণ করা হয় ‘কদম রসুল’। এক সময় আন্দরকিল্লা মসজিদের চেয়ে কদম রসুল মসজিদটি বেশ জনপ্রিয়তা পেতে থাকে। যার কারণে আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ মুসল্লিদের গ্রহণযোগ্যতা হারায়। এক পর্যায়ে মসজিদটি লোকশূন্য হয়ে পড়লে এ সুযোগটি কাজে লাগিয়ে ১৭৬১ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদটিকে তাদের গোলাবারুদ রাখার গুদাম হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। ১৮৮৫ সালে নবাব হামিদুল্লাহ খাঁর বিশেষ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মসজিদটি ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের জন্য পুনরায় উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। এরপর ১৬৬৭ সাল থেকে এ মসজিদ ঘিরে চট্টগ্রামের ইসলামি ধর্মাবলম্বীদের ব্যাপক আনাগোনা শুরু হয়। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই মহানবীর বংশধররা (আওলাদে রাসুলরা) এ মসজিদের খতিব হিসেবে নিযুক্ত হতেন। যার ধারাবাহিকতা এখনো রয়েছে। বর্তমানে এ মসজিদটির খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আওলাদে রাসুল সাইয়্যেদ আনোয়ার হোসাইন তাহের জাবেরি আল মাদানি এবং নিয়মিত ইমামতি করছেন ৩ জন ইমাম, ২ জন মুয়াজ্জিন ও ৭ জন খাদেম।

মসজিদটির সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মসজিদে প্রতিদিন অন্তত ৪ হাজার মুসল্লি নিয়মিত নামাজ আদায় করতে পারার ধারণ ক্ষমতা রয়েছে। মসজিদে প্রতি শুক্রবার একত্রে গড়ে ৮ থেকে ৯ হাজার মানুষ নামাজ আদায় করেন। পবিত্র রমজান মাসের জুমআতুল বিদায় ২০ থেকে ২৩ হাজার মানুষের বিশাল জামাত অনুষ্ঠিত হওয়ার নজিরও রয়েছে।

প্রতি বছর পবিত্র মাহে রমজানের প্রথম রোজা থেকে শেষ রোজা পর্যন্ত এই মসজিদে নগরের বিত্তবান শিল্পপতিদের অনুদানে ২ থেকে ৩ হাজার মানুষের জন্য বিশাল ইফতারের আয়োজন করা হয়। ইফতার আয়োজনে অংশ নিতে বিভিন্ন গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ছুটে আসেন শত শত মানুষ।  রমজানে মসজিদের আরও একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, মুসলমান রোজাদার ব্যক্তিরা ছাড়াও হিন্দু ধর্মাবলম্বীর মানুষরাও ইফতারে শরিক হন। তাদের মতে, এই মসজিদে ইফতার গ্রহণ করলে সুফল লাভ করা যায়। প্রায় ১ দশক আগে শুরু হওয়া মসজিদের বিশাল এ ইফতার আয়োজনে আর্থিকভাবে যারা সহযোগিতা করেন তাদের বেশিরভাগই চট্টগ্রামের শিল্পপতি। তবে তাদের অনুরোধেই এত বড় আয়োজনে তাদের নাম প্রকাশ করা হয় না।

চন্দনপুরা হামিদিয়া তাজ মসজিদ

বাংলাদেশের ঐতিহাসিক স্থাপত্যশৈলীর অন্যতম নিদর্শন বন্দরনগরী চট্টগ্রামের চন্দনপুরা হামিদিয়া তাজ মসজিদ। চোখ ধাঁধানো কারুকাজে সুসজ্জিত মসজিদটি নির্মিত হয় নবাব শায়েস্তা খাঁর আমলে। ঐতিহাসিক সূত্রগুলো বলছে, ১৬৬৬ সালে নবাব শায়েস্তা খাঁর সেনাদল আরাকান মগরাজাদের কবল থেকে চট্টগ্রামকে স্বাধীন করার পর চট্টগ্রাম অঞ্চলে অনেক মসজিদ নির্মাণ করা হয়। শায়েস্তা খাঁর শাহি ফরমানে এসব মসজিদ নির্মিত হয়। চন্দনপুরা হামিদিয়া তাজ মসজিদ সেগুলোর একটি।

নগরীর চকবাজার ওয়ার্ডে অবস্থিত দৃষ্টিনন্দন মসজিদটি ঘিরে রয়েছে মানুষের ব্যাপক আগ্রহ ও আনাগোনা। প্রতিদিন দেশি-বিদেশি অসংখ্য দর্শনার্থী আসে তাজ মসজিদ দেখতে।

মোগল আমলে নির্মিত তাজ মসজিদের রয়েছে ১৫টি গম্বুজ। এর মধ্যে বড় গম্বুজটি নির্মাণে তৎকালীন সময়ের প্রায় চার লাখ টাকার ১৫ মণ রুপা ও পিতলের প্রয়োজন হয়, যা সংগ্রহ করা হয় ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে। গম্বুজের চারপাশে লেখা আছে রাসুল (সা.)-এর পরিবার ও দুনিয়ায় জান্নাতের সুসংবাদ পাওয়া ১০ সাহাবির নাম। মসজিদটির সুউচ্চ মিনার থেকে শুরু করে দেয়াল, উঁচু পিলার, দরজা-জানালা সব কিছুতেই রয়েছে নান্দনিক কারুকাজ।

সাহেব বিবি মসজিদ

৫০০ বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী সাহেব বিবি মসজিদ। চট্টগ্রাম এর রাউজান উপজেলায় অবস্থিত। এই মসজিদের অবস্থান রাউজান উপজেলার ৯ নং ওয়ার্ড এর হাড়ি মিয়া চৌধুরী বাড়িতে। প্রায় ৫০০ বছর পূর্বে মোগল আমলে বিদেশী কারিগর দিয়ে চুন সুরকির গাঁথুনিতে নির্মাণ করা হয় এই স্থাপত্য। এটি ৮ টি পিলার,৩ টি দরজা, ২ টি জানালা ও ১ টি গম্বুজ বিশিষ্ট। এতে প্রবেশের জন্য ৪ ফুট উঁচু করে মসজিদ গেইট নির্মাণ করা হয়েছে। জানা যায়, জমিদার আমির মোহাম্মদ চৌধুরীর পত্নী ও চট্টগ্রামের আলোচিত প্রসিদ্ধ মালকা বানুর মাতা সাহেব বিবি এই মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা।

বজরা শাহী মসজিদ

বজরা শাহী মসজিদ ১৮শ শতাব্দীতে নির্মিত নোয়াখালী জেলার সোনাইমুড়ী উপজেলাধীন বজরা ইউনিয়নের অবস্থিত একটি মসজিদ। এটি মাইজদীর চারপাশের "সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক স্থাপনা" গুলির একটি। ২৯ নভেম্বর ১৯৯৮ থেকে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ বজরা শাহী মসজিদের ঐতিহ্য রক্ষা এবং দুর্লভ নিদর্শন সংরক্ষণের জন্য কাজ করছে।

মসজিদটি নোয়াখালী থেকে ২০ কিলোমিটার (১২ মাইল) উত্তরে বজরা নামক গ্রামে অবস্থিত। মসজিদটির চারপাশ প্রাচীর দিয়ে ঘেরা, মসজিদে প্রবেশকরার পথটি পূর্ব দিকে। মসজিদটি দিঘীর পশ্চিম পার্শ্বে উঁচু ভিত্তির ওপর নির্মিত।

বখশী হামিদ মসজিদ

বখশী হামিদ মসজিদ চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালী উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের ইলশা গ্রামে একটি দীঘির পাড়ে নির্মিত প্রাচীন একটি মসজিদ। এই মসজিদটির নির্মাণ কৌশলের সাথে ঢাকার শায়েস্তা খান (আনুঃ ১৬৬৪ খৃঃ) মসজিদ এবং নারায়ণগঞ্জের বিবি মরিয়ম মসজিদের (আনুঃ ১৬৮০ খৃঃ) মিল লক্ষ্য করা যায়।

১৫৬৮ সালের ৯ মার্চে নির্মিত এই ঐতিহ্যবাহী মসজিদের রক্ষিত শিলালিপির তথ্য মতে, এটি সুলাইমান কররানি কর্র্তৃক প্রতিষ্ঠা করার কথা থাকলেও জনমুখে বখশী হামিদের নির্মিত মসজিদ বলেই বেশ পরিচিত। যার কারণে স্থানীয়রা এটিকে বখশী হামিদ মসজিদ নামেই চেনেন।

ব্রেকিংনিউজ/এসপি

bnbd-ads