জনবান্ধন পুলিশিং বনাম পুলিশবান্ধব পুলিশিং

মফিজুর রহমান পলাশ
৪ ডিসেম্বর ২০২০, শুক্রবার
প্রকাশিত: ০৭:২২ আপডেট: ০৩:১৪

জনবান্ধন পুলিশিং বনাম পুলিশবান্ধব পুলিশিং

ছেলেবেলায় খাকি পোশাকে কাউকে দেখলেই ভয়ে আঁতকে উঠতাম। ডাকপিয়ন হোক, বা পুলিশ কনস্টেবল- দেখলেই ভয়ে আত্মারাম খাঁচাছাড়া হওয়ার জোগাড় হতো। পান থেকে চুন খসলেই বাড়ির মুরুব্বিরা ভয় দেখাতেন পুলিশ এসে ধরে নিয়ে যাবে! একবার জেলে গেলে বছরের পর বছর বাড়ি আসতে দেবে না! বাড়ি ছেড়ে কেমনে জেলে দিন কাটাবে? জেলখানায় একটা রুটি আর রুটির ওপরে একটু গুড় ছুঁয়ে দেয়া হতো। সুতরাং কোনোভাবেই পুলিশের হাতে ধরা পড়া যাবে না।

মাঝে মাঝে গ্রামের কোনও বাড়িতে আসামি ধরতে এসে পুলিশের লোকজনের যা হম্বিতম্বি দেখেছি তাতে ভয়ের মাত্রা আরও বেড়ে যেতো। বুক দুরুদুরু করতো। এই বুঝি একটা আধাসিদ্ধ রুটির ওপর ঝোলা গুড়ের মেন্যু রেডি হলো বলে!

সময়ের পরিক্রমায় সেই পুলিশ ধীরে ধীরে হলেও যথেষ্ট জনবান্ধন পুলিশে পরিণত হয়েছে। জনসেবায় পুলিশের মনোজগতেও ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী, আড্ডাবাজ ও মানবিক ছেলে-মেয়েগুলো দলে দলে এই বাহিনীতে যোগ দিচ্ছেন। সুতরাং পুলিশে গুণগত পরিবর্তন এখন সাদা চোখেও দৃশ্যমান। যদিও যথেষ্ট ব্যতিক্রম রয়েছে এবং ব্যতিক্রম সবসময় উদাহরণও নয়। 

আজ আপনি ৯৯৯ এ ফ্রি ডায়াল করলেই পুলিশ আপনার দরজায় গিয়ে হাজির হচ্ছে। আপনি গহীন অরণ্য বা মাঝ নদীতে কোনও সমস্যায় পড়ে জাস্ট একটা কল করলেই আপনার পাশে পৌঁছে যাচ্ছেন বাংলাদেশ পুলিশের সদস্যরা। হালের করোনাকালে পুলিশ তার ইতিহাসের সেরা মানবিক ও সাহসী গল্প রচনা করেছে। এসবই সম্ভব হয়েছে কর্মকর্তা ও সদস্যদের একাগ্রতা ও জনপ্রেমের চেতনা থেকে। জনগণের পাশে বন্ধুর মতো থাকার মন্ত্রে দীক্ষিত হাজারো তরুণ পুলিশকে আরও বেশি মানবিক ও জনবান্ধন একটি বাহিনীতে পরিণত করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন।

তবে সঙ্গত কারণে একটা প্রশ্ন সামনে চলে আসে। পুলিশ দিনদিন জনবান্ধন বাহিনীতে পরিণত হচ্ছে বটে, কিন্তু পুলিশ কি যথেষ্ট পরিমাণ পুলিশবান্ধব হচ্ছে? আবারও বলি পুলিশ বাহিনী কি আসলেই পুলিশবান্ধব হচ্ছে?

আইন অনুসারে একজন পুলিশ সদস্যকে ২৪ ঘণ্টা অন ডিউটি মানে কর্মে নিয়োজিত থাকতে হয়। সারাদিনের কর্মক্লান্ত মানুষটি মধ্যরাতে বাসায় গিয়ে প্রিয় সন্তানকে বুকে জড়িয়ে একটু ঘুমের ঘোরে গেলেন তো অমনি ফোনে আদেশ এলো রাস্তায় ডাকাতি হচ্ছে। মুভ কুইকলি। সন্তানের শত কান্না, স্ত্রীর হতাশায় ভরা চোখ-মুখ তবু দায়িত্বের ডাক থেকে বিন্দুমাত্র টলাতে পারে না একজন পুলিশ অফিসারকে। কর্তব্যের টানে মানুষের ঘোরতর বিপদের দিনে পুলিশ সদস্যরা পাগলের মতো ছুটে যান ঘটনাস্থলে। গুলশানের হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার ঘটনায় আগপাছ না ভেবেই ছুটে গিয়েছিলেন পুলিশের অসীম সাহসী ও নির্ভীক সদস্যরা। মানুষকে বাঁচাতে তারা ঝাপিয়ে পড়লেন জঙ্গিসংকুল মৃত্যুকূপে। জনগণকে বাঁচাতে শরীরের শেষ রক্তবিন্দু ঢেলে দিলেন। এই গল্প পুলিশের অধিকাংশ সদস্য ও কর্মকর্তার জীবনের গল্প। 

এত এত ত্যাগ ও সাহসিকতার পেছনের গল্পগুলো কখনো কখনো বেশ করুন। কখনো কখনো এমনও হয় যে একখানা পাতলা কাগজে লেখা আদেশে পুলিশকে রাতারাতি টেকনাফ থেকে তেতুলিয়ায় পাঠিয়ে দেয়া হয়। যে পুলিশ মানুষের বিপদে সবার আগে পৌঁছে যান, মানুষ বাঁচাতে অকাতরে জীবন উৎসর্গ করতে পিছপা হননা, সেই পুলিশও একটু মানবিকতা আশা করে থাকেন। দূরবর্তী ইউনিটে বদলি করার আগে একটিবার ভাবা উচিত তার ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার কি হবে? তার বৃদ্ধ বাবা-মাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কোনো লোক আছে কি-না। তবুও কর্তৃপক্ষের আদেশ মেনে তল্পিতল্পা গুটিয়ে, খাট, বিছানা ট্রাকে তুলে নতুন কর্মস্থলে যেতে বাধ্য করা হয়। তখন কি একটিবারের জন্যও খোঁজ নেয়া হয় এই ট্রাকের ভাড়া কত আসে? কত টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়, আর কত খরচ হয়? এই বাড়তি টাকা কোথায় পাবে সে? সবার তো বাড়তি ইনকাম থাকেনা। আগে যা সামান্য টিএ/ডিএ বিল দেওয়া হতো ইদানিং সেটাও বন্ধ হয়ে গেছে। 

পুলিশের কষ্টের গল্পের কি শেষ আছে......? পুলিশের কাজ জটিল ও শ্রমসাধ্য। এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনিচ্ছাকৃত ভুলভ্রান্তি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবু, কয়জন বস আছেন যারা অধস্তনদের পাশে বসিয়ে, কুঁচকে থাকা ইউনিফর্মের কাঁধ বরাবর হাত রেখে মমতাভরে জানতে চান, তোমার সংসার কেমন চলছে? কোনো দুশ্চিন্তা করছো নাকি? তোমার বাবার মাসে কত টাকার ওষুধ লাগে? তোমার ভার্সিটি পড়ুয়া ছোট ভাই কোন ইয়ারে উঠলো? এই সামান্য কয়টা টাকায় কেমনে মাস চালাও? যদিও এগুলো নিছক কল্পনা তবু যেকোনো অফিসের জুনিয়র সদস্যরা ঊর্ধ্বতনদের কাছে এই সামান্য মানবিকতা আশা করতেই পারেন। 

ঢাকা থেকে রংপুরে, রংপুর থেকে বান্দরবানে আর বান্দরবান থেকে সুন্দরবনে বদলি করে দেওয়ার আগে একটিবারও কি ভাবা হয়- এই ছেলেটার মনোজগতে কি বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে? কত ধরনের আর্থিক, সামাজিক ও পারিবারিক সমস্যা তৈরি হতে পারে? বাহিনীর সদস্য হয়ে এক কমান্ডেই নির্দেশ পালন করতে অভ্যস্থ হলেও এই পুলিশই তো যথেষ্ট মানবিকতার নজির স্থাপন করে চলেছেন। তাহলে বাহিনীর দোহাই দিয়ে কেনো আমরা আমাদের নিজেদের প্রতি মানবিকতার হাত প্রসারিত করা থেকে বিরত থাকবো?

পুলিশের এত এত কর্মঘণ্টার বিপরীতে বেতন-ভাতা নিতান্তই অপ্রতুল। নেই পর্যাপ্ত যানবাহন সুবিধাও। এছাড়াও চরম মানবিক সংকট চলছে আবাসন খাতে। চিকিৎসা সেবাও সব জায়গায় পর্যাপ্ত নয়। ছুটিছাটার বিষয়টিও মানবিকভাবে বিবেচনা করা এখন সময়ের দাবি। ট্রেনিং সেন্টার ও নন অপারেশনাল পদে কর্মরত সদস্য ও কর্মকর্তাদের বিশেষ ভাতা চালু করা সময়ের দাবি। 

একই ইউনিটে কর্মরত সদস্যদের সিনিয়রিটি-জুনিয়রিটি বিষয়টি মাথায় রেখে পোস্টিং/পদোন্নতি দেওয়া হলে সদস্য ও কর্মকর্তার মনে ক্ষোভ সৃষ্টির সুযোগ থাকবে না। কিন্তু একই ইউনিটে সিনিয়র কর্মকর্তাকে টপকে জুনিয়র যখন অধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়িত হোন, সেটা হীনমন্যতা ও বিব্রতকর অবস্থা তৈরি করে বৈকি। জুনিয়র কর্মকর্তা যখন ভালো গাড়িতে চড়ে সিনিয়রদের সামনে দিয়ে যান, তখন একবারের জন্য হলেও সিনিয়রের নিঃশ্বাস দীর্ঘায়িত হয়। এসব ঘটনায় আইনের ব্যত্যয় না হলেও মানবিকতা লঙ্ঘিত হয় চরমভাবে। এর কারণে বাহিনীতে হীনমন্যতাবোধ প্রকট হয়। এ কারণেই সদস্য ও কর্মকর্তার বদলি ও পদোন্নতি হোক মানবিকতা, সাম্য ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে। পুলিশ বদলির চাকরি হলেও দূরবর্তী ইউনিটে বদলি করার আগে একটিবারের জন্য হলেও যেনো প্রার্থীর পরিবারের ওয়েলফেয়ারের বিষয়টি ভেবে দেখা হোক। কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে বদলির আগেই সংক্ষিপ্ত আকারে হলেও অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দেখা যায়। অকারণ বলির পাঠা হওয়ার জন্য হাজার হাজার তরুণ দেশ সেবার স্বপ্ন দেখে পুলিশে যোগদান করেননি। দেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণে আত্মনিয়োগ করাই তাঁদের লক্ষ্য। কিন্তু নিজের পরিবারকেই সুবিচার দেয়া সবসময় সম্ভব হয়ে ওঠেনা। এটা বড়ই হতাশার যা হৃদয়ে রক্তক্ষরণ করে, মানসিকভাবে ভেঙে দেয়। আর কোনও এএসপি আনিসুল করিমের নিথর দেহ দেখে বিচার চাইতে চাইতে মুখে ফেনা তুলতে চাই না। 

নিউটনের গতির তৃতীয় সূত্র বলছে, প্রত্যেক ক্রিয়ার সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া রয়েছে। আমরা আমাদের নিজেদের সদস্য ও কর্মকর্তাদের সাথে যেমন আচরণ করবো তেমন একটা ফিডব্যাকও আমরা জণগনকে প্রদান করবো। 

সর্বোপরি মানবিকতার যে গল্পগুলো আমরা জণগণকে উপহার দিয়ে ধন্য হই, সেই একই গল্পগুলো আমরা পুলিশের ক্ষেত্রেও শুনতে চাই। জনবান্ধব পুলিশিং করতে হলে সবার আগে প্রয়োজন “পুলিশবান্ধব পুলিশিং” চালু করা। ইউনিট প্রধান তার অধীন কর্মরতদের যেন নিজের সন্তানের মতো আগলে রাখেন। তাহলেই কেবল দেশ, জাতি ও মানবিকতার অপরিসীম কল্যাণ সাধিত হবে। এটা সম্ভব হলেই ক্যাম্পাসের শীর্ষ মেধাবী ও মানবিক ছেলেটা-মেয়েটা পুলিশে আসতে উৎসুক হবেন। জনগণ তাদের বিশ্বস্ত বন্ধু পুলিশকে পাশে পেয়ে ধন্য হবেন।

লেখক: সিনিয়র এএসপি, রংপুর আরআরএফ

এই লেখকের আরও: 

উগ্র-জঙ্গি-জংলির ‘ঠাঁই হবে না’ সোনার বাংলায়

ব্রেকিংনিউজ/টিটি/এমআর

bnbd-ads