ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে কিশোর গ্যাং, উত্তরণের উপায় কী?

এ.আর.ইমরান
১৩ অক্টোবর ২০২০, মঙ্গলবার
প্রকাশিত: ১১:২৬ আপডেট: ০৩:২০

ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে কিশোর গ্যাং, উত্তরণের উপায় কী?

কিশোর গ্যাং বর্তমান সময়ে এক আতঙ্কের নাম। আতঙ্ক বলছি একারণে যে, এরা কোনও ধরনের বিচার-বিশ্লেষণ বা পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই ভয়ঙ্কর সব অপরাধ সংগঠিত করে থাকে। অথচ বিংশ শতাব্দিতে কিশোর গ্যাংয়ের তেমন কোনও অস্তিত্বই ছিল না। একবিংশ শতাব্দির শুরুর দিকে স্বল্প পরিসরে কিশোর গ্যাংয়ের উত্থান শুরু। যা বর্তমানে মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে কিশোর গ্যাং গ্রাম থেকে শহর এমনকি দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। 

বর্তমান শতাব্দির শুরুর দিকে আমরা যখন ডিজিটালাইজেশনের সুবিধা পেতে থাকি : মূলত তখন থেকেই মোবাইল, ইন্টারনেট পরিষেবাগুলো পর্যায়ক্রমে সহজলভ্য হতে থাকে এবং পরবর্তীতে তা কিশোরদের মাঝেও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বিজ্ঞানের প্রত্যেকটি নতুন সংযোজন বা আবিষ্কার আমাদের জন্য যেমন আশীর্বাদ নিয়ে আসে তেমনই নগন্য সংখ্যক অভিশাপও বয়ে আনে। মোবাইল ফোন সহজলভ্য হবার পর কিশোরদের কাছে তা অতি দ্রুত পৌঁছে যায়। ফলে একত্রিত হওয়া বা তথ্য আদান প্রদান আরও বেশি সহজতর হয়। কোনও অপরাধ সংঘটিত করার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে জড়ো হতে সময়ক্ষেপণ করতে হয় না তাদের। অন্যদিকে কিশোররা ইন্টারনেটের যথাযথ ব্যবহার না করে পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত হয়ে পড়ছে, যার ফলশ্রুতিতে প্রতিনিয়ত ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন, ইভটিজিংয়ের মতো মারাত্মক অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত খেলার মাঠ না থাকার দরুন মোবাইলে ইন্টারনেটের মাধ্যমে অ্যাকশনধর্মী গেম খেলছে এবং হরর ফ্লিম দেখছে তারা। এগুলো তাদের মগজে ঢুকে যাচ্ছে।

একটা সময় ছিল যখন গ্রামের কিশোরেরা মুরুব্বিদের ভয় পেত, সম্মান করতো। এখন পরিস্থিতি ও পরিবেশটা এমন হয়ে উঠেছে, উল্টো মুরুব্বিরা তাদেরকে ভয় পায়। আর সে ভয়টা নেহায়েত নিজের আত্মসম্মান বজায় রাখার জন্য। 

সম্প্রতি খুন, অপহরণ, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মাদক কেনাবেচা এবং দলবেঁধে এক গ্রুপ আরেক গ্রুপের ওপর হামলা করার মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে কিশোরেরা। মোটকথা প্রতিনিয়ত ভয়ংকর হয়ে উঠেছে কিশোর গ্যাং সদস্যরা। 

ভার্চুয়াল মাধ্যমে গ্রুপ সৃষ্টি করে সংঘবদ্ধভাবে অপরাধে জড়ানোই কিশোর গ্যাং এর মূল বৈশিষ্ট্য।   কেবল রাজধানীতেই অর্ধশতাধিকের বেশি কিশোর গ্যাং রয়েছে। কয়েক বছর আগে উত্তরার আদনান কবির হত্যার পর এই ‘গ্যাং কালচারের’ বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। রাজধানীর বাহিরেও কিশোর গ্যাংয়ের উত্থান চোখে পড়ার মতো।

২০১৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে ময়মনসিংহে হত্যা মামলার আসামিসহ ছিনতাইকারী চক্রের সংঘবদ্ধ কিশোর গ্যাং গ্রুপের ১০ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে র‍্যাব। অন্য দিকে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে মহানগরের ১৬ এলাকায় শতাধিকের বেশি কিশোর গ্যাং গ্রুপ গজিয়ে উঠেছে এবং নোয়াখালীতে সক্রিয় রয়েছে অন্তত আরও ৮টি কিশোর গ্যাং।

গত ১২ এপ্রিল রাতে টাঙ্গাইল নতুন বাসস্ট্যান্ডে বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন এক দম্পতি। এ সময় কয়েকজন বখাটে কিশোর ওই দম্পতিকে ভয়ভীতি দেখিয়ে স্বামীকে মারধর করে স্ত্রীকে উঠিয়ে নিয়ে রাতভর ধর্ষণ করে। 

অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে দিকে আশুলিয়ায় দুই কিশোরীকে ১২ কিশোর  মিলে গণধর্ষণের অভিযোগে গ্যাংয়ের চার সদস্যকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তারা জোরপূর্বক ধর্ষণ ও ভিডিও ধারণ করে। পরবর্তীতে প্রায় এক মাস পর তাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে ভিডিওটি ফাঁস হয়ে যায়। ভিডিও ফাঁস হলে ভুক্তভোগীরা গ্রামে চলে যেতে বাধ্য হয়। কোথায় নেই কিশোর গ্যাং!! বর্তমান সময়ে  এমন একটি এলাকা বা অঞ্চল খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। যেখানে কিশোর গ্যাং এর অস্তিত্ব নেই!! 

যে দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন মূলত ক্ষমতাসীন দলের ব্যানারে নেতাদের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে ভয়ংকর সব অপরাধ সংঘটিত করে থাকে প্রতিনিয়ত। গ্যাং এর লিডার নেতাদের আশীর্বাদ পুষ্ট থাকে বিধায় নির্ভয়ে তারা তাদের অপকর্মগুলো চালিয়ে যেতে পারে। 

প্রত্যেকটি কিশোর আপনার, আমার, আমাদেরই সন্তান। প্রত্যিটা মা বাবার স্বপ্ন থাকে ছেলে আমার বড় হয়ে মানুষের মত মানুষ হবে। তবু কেন আপনার, আমার সন্তানেরা আজ বিপথগামী? 

কেনইবা তারা সংঘটিত করছে ভয়ঙ্কর সব অপরাধ? তৈরি করছে সঙ্ঘবদ্ধ কিশোর গ্যাং। আমরা প্রথমদিকে হয়তো তাদের অপরাধের মাত্রা তেমনটা আচ করতে পারি না, যখন পারি তখন হয়তোবা আমাদের কিছুই করার থাকে না। 

অপরাধ বিজ্ঞানীদের মতে, একজন কিশোর নানাবিধ কারণে অপরাধপ্রবণতা দিকে ধাবিত হতে পারে। তার মধ্যে অন্যতম কারণ হলো মা বাবার সন্তানের প্রতি উদাসীন মনোভাব এবং অসচেতনা।

এছাড়াও পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, মাদক, সিনেমার হিরোর মত চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার  প্রবণতা, মা-বাবার দাম্পত্য কলহ, সামাজিক ও পারিবারিক অনুশাসন ভেঙে যাওয়ায়, বন্ধুদের মধ্যে নিজেকে জাহির করার প্রবণতা, মেয়ে বন্ধুদের আকর্ষন করার প্রবণতা থেকেও অনেকেই কিশোর গ্যাং এর মত সঙ্ঘবদ্ধ চক্রে জড়িয়ে পড়ে। উপরোক্ত কারণ ছাড়াও আরও বেশ কিছু কারণ রয়েছে যার জন্য কিশোরেরা প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে অপরাধপ্রবণতার দিকে ধাবিত হয়।

পুলিশ এবং সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন, অ্যাডভেঞ্চার বা ক্ষমতা দেখানোর লোভ, মাদক, খারাপ বন্ধুদের পাল্লায় পড়াসহ নানা কারণে কিশোর গ্যাংগুলো তৈরি হচ্ছে।

কোনও গ্যাং অপরাধ সংঘটিত করার পূর্বে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী জোরালো কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় তারা আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে ওঠে এবং নিজেদের সুসংগঠিত করে ফেলে। তাই প্রতিটি এলাকায় পুলিশ যদি কিশোরদের সঙ্ঘবদ্ধ হওয়ার আগেই রুখে দিতে পারতো তাহলে কিশোর গ্যাং এর ব্যাপকতা অনেকটাই কমে আসত বলে মনে করেন অনেকেই। 

একজন শিশু জন্মগ্রহণ করার পর মা-বাবার দেয়া শিক্ষা নিয়েই ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। তাদের আচার-আচরণ, ব্যক্তিত্ব, এক্সপ্রেশনগুলো প্রতিটি শিশু স্বল্প সময়েই আয়ত্ত করে ফেলে। ক্রমান্বয়ে বয়স বাড়ার সাথে সাথে তাদেরকে গতানুগতিক শিক্ষার পাশাপাশি মানবিক, ধৈর্য ধারণ, সহনশীলতা, সততা ব্যক্তিত্ববান বা সচ্চরিত্রের বাস্তবধর্মী শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। অর্থনৈতিক,সামাজিক বৈষম্যকরন সম্পর্কে তাদেরকে পজিটিভলি ব্রিফ করতে হবে। যাতে করে তারা হীনমন্যতায় না ভোগে। 

দাম্পত্য কলহ বা স্বামী স্ত্রীর মধ্যে বিরোধ থেকে থাকলেও তা সন্তানদের কাছ থেকে আড়াল করে রাখতে হবে। সন্তানদের যৌক্তিক চাওয়া পাওয়া গুলো পূরণ করার চেষ্টা করতে হবে যদি আর্থিক সামর্থ্য না থাকে এক্ষেত্রে তাদেরকে বুঝিয়ে নিবৃত্ত করতে হবে। সরাসরি না বলার প্রবণতা যতটুকু সম্ভব পরিহার করার চেষ্টা করতে হবে। মনে রাখবেন নগদ টাকা স্বীয় সন্তানের হাতে না দেয়াটাই শ্রেয়। এতে করে তারা নিষিদ্ধ পণ্য বা বস্তুর প্রতি তারা অভ্যস্ত হয়ে যেতে পারে। সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটি গুরুত্ব দিতে হবে তা হলো, আপনার সন্তানের চলাফেরা গভীরভাবে নজরদারি করতে হবে। কোথায় কখন কার সাথে সে আড্ডা দিচ্ছে বা মিশছে তা অবশ্যই আপনাকে অবগত থাকতে হবে।

কোনও কিশোর একবার বিপথগামী হয়ে গেলে সেখান থেকে তাকে ফেরানোটা কঠিন। তাই সন্তান ভুল পথে পা বাড়ানোর আগেই তাদেরকে ফেরান! নিজে সতর্ক থাকুন এবং অন্যকেও সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিন। 

আজকের কিশোর আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তারাই হবে সোনার বাংলা গড়ার দৃঢ় কারিগর, রাষ্ট্রের পরিচালক এবং নীতি নির্ধারক। এই কিশোরাই যদি বিপথগামী হয় তাহলে আগামী দিনের রাষ্ট্রের কী হবে? 

লেখক: সাংবাদিক

ব্রেকিংনিউজ/এমআর

bnbd-ads