আওয়ামী লীগে অন্তর্কলহ: সমাধানের পথ কী?

এ.আর.ইমরান
৪ অক্টোবর ২০২০, রবিবার
প্রকাশিত: ১২:২৪ আপডেট: ১২:২৭

আওয়ামী লীগে অন্তর্কলহ: সমাধানের পথ কী?

উপজেলা পরিষদ নির্বাচন-২০১৯ মোট চারটি ধাপে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। প্রথম ধাপে ১০ মার্চ ৮৭ উপজেলায়, দ্বিতীয় ধাপে ১৮ মার্চ ১২৯ উপজেলায়, তৃতীয় ধাপে ২৪ মার্চ ১২৭ উপজেলায় ও চতুর্থ তথা শেষ ধাপে ৩১ মার্চ ১২২টি উপজেলায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। 

২০১৯ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দেশের অন্য কোনও দল অংশগ্রহণ না করায় উপজেলা চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের নৌকা ও আওয়ামী বিদ্রোহীদের মধ্যে মূলত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন। নির্বাচন পূর্ববর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এক ব্রিফিংয়ে নৌকার বাহিরে বিদ্রোহী প্রার্থীরাও মূলত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সুযোগ পেয়ে যায়। তারা যে ম্যাসেজটি পেয়েছিলো তা হলো বিদ্রোহী প্রার্থীদের ক্ষেত্রে দলীয়ভাবে কোনও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না।
 
পরের ঘটনা আপনাদের অনেকেরই জানা। ওবায়দুল কাদের হঠাৎ মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে এয়ার এম্বুলেন্সে বিদেশে পাঠানো হয়। উনার অনুপস্থিতিতে, নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে কাদের সাহেবের মন্তব্য থেকে আওয়ামী লীগ কিছুটা পিছু হাঁটে। দলের সিনিয়র নেতারা কাদের সাহেবের মন্তব্যর সাথে দ্বিমত পোষণ করেন। শেষ পর্যন্ত একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ বিদ্রোহী প্রার্থীদের কিছুটা ছাড় দিতে বাধ্য হয়। যার ফলশ্রুতিতে নিঃসংকোচে সকল বিদ্রোহী প্রার্থীরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। 

নির্বাচন পরবর্তী সময়ে দলের হাইকমান্ড থেকে সকল বিদ্রোহী প্রার্থীদের শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে শোকজ নোটিশ প্রদান করার পাশাপাশি কারণ দর্শাতে বলা হয়। পরে  কিছু শর্তসাপেক্ষে সকল বিদ্রোহী প্রার্থীদের সাধারণ ক্ষমা করা হয়। 

চতুর্থ ধাপের নির্বাচন শেষে দেখা যায়, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র তিন মাসের মধ্যে দেশের ১৩৫টি উপজেলায় নৌকার প্রার্থীরা হেরে যায়। অথচ ভোটের মাঠে বিএনপিসহ সরকারবিরোধী দলগুলো ছিল না। অনেকটা একতরফা সেই নির্বাচনে দলের বিদ্রোহী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কাছে ওই উপজেলাগুলোতে পরাজিত হয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। মন্ত্রী-সাংসদদের অনেকে বিদ্রোহীদের পক্ষে ছিলেন বিধায় নৌকার প্রার্থী এবং বিদ্রোহীদের মধ্যে একটা বিভাজন তৈরি হয়, যা এখন পর্যন্ত অব্যাহত আছে। 

যারা নৌকা প্রতীক পেয়েছিলেন তারা জয়ের ব্যাপারে অনেকটাই নিশ্চিত ছিলেন! কিন্তু একদলীয় উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অন্য কোনও দল অংশগ্রহণ না করায় নিজ দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের সাথেই মূলত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। ফলে নির্বাচন অনেকাংশে সুষ্ঠু হয় বিধায় নৌকার অনেক প্রার্থীরা হেরে যায়। 

যারা ভোটে হেরেছেন তারাও আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা। হেরে যাবার পর দলীয়ভাবে নিজের দলের কাছে স্বীয় ইমেজ সংকটে পড়ে যায় অনেকেই। পাশাপাশি হতাশ হয়েছেন তাদেরই দলের  পরীক্ষিত অনেক নেতাকর্মীরা। যেহেতু বিদ্রোহী প্রার্থীদের পক্ষে অনেক সাংসদ এবং মন্ত্রীরা কাজ করেছিলেন তাই পরাজিত প্রার্থীরা তাদের নিজ এলাকায় কোনঠাসা হয়ে পড়েন। সরকারি দলে থেকেও তারা যেন বিরোধী দলে আসীন হয়ে আছেন। এটা তাদের জন্য কত বড় কষ্টের, গ্লানির এ কেবল তারাই উপলব্ধি করতে পারছেন। 

দেশের প্রায় প্রতিটি উপজেলায় সাংসদ এবং মন্ত্রীদের মদদপুষ্ট সুনির্দিষ্ট একক প্রার্থী ছিল। নৌকা প্রতীক অথবা বিদ্রোহী উভয় প্রার্থীদের ক্ষেত্রে তারা পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নেন। এ ক্ষেত্রে কোনও কোনও জায়গায় তারা জয়লাভ করেন, কোথাওবা পরাজিত হন। ঘুরেফিরে বিষয়টি এমন দাঁড়ালো যে, প্রত্যেকটি উপজেলায় সাংসদ এবং মন্ত্রীদের সাথে বিজয়ী অথবা পরাজিত স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের একটি অন্তর্দ্বন্দ্ব রয়েই গেল। একজন মেম্বার অফ পার্লামেন্ট এবং মন্ত্রীর দাপটের সাথে উপজেলা চেয়ারম্যান বা স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা অনেকটা অসহায় বিধায় এ বিভাজনটা তৈরি হলো। যা আগামী দিনগুলোতে তৃণমূলের রাজনীতিতে বড় ধরনের অন্তর্কোন্দল তৈরিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করেন অনেকে। 

পরাজিত এমন অনেক প্রার্থীদের দেখেছি, যারা স্বাধীনতা সংগ্রামের সেই সময়কাল থেকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে বুকে লালন করে বড় হয়েছেন, অথচ তারা এখন অবহেলিত। শুধু তারাই নয়, বরং যারা পরাজিত প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছিলেন বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতৃবৃন্দ তারাও আজ নিজ দলে   নিগ্রহের শিকার। কিন্তু কেন? কেন এই বিভাজন? তারা এমন কি অপরাধ করেছেন যে, যার মাশুল দিতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত? তাদের চাপা কষ্টের বহিঃপ্রকাশ অনেকটা অভিমানের মতই। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পরাজিত নৌকা প্রার্থীর একজন কর্মী বলেন, ‘আমার বাপ-দাদাসহ আমরা সকলেই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। উপজেলা নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের পক্ষে কাজ করেছি বলে স্থানীয় সাংসদ আমাদের কোনঠাসা করে রেখেছেন। আমরা তো অন্যায় কিছু করিনি। বঙ্গবন্ধু এবং শেখ হাসিনার নৌকার পক্ষে কাজ করেছি। তবে আজ আমরা কেন প্রতিহিংসার শিকার হচ্ছি? এহেন পরিস্থিতিতে আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে এর  সঠিক সমাধান চাই।’ 

সত্যি বলতে একমাত্র প্রধানমন্ত্রীই পারেন এহেন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে। বাংলাদেশের সিংহভাগ উপজেলায় উপজেলা পরিষদ নির্বাচন পরবর্তী সময়ে অন্তর্কোন্দল এবং বিভাজন তৈরি হয়েছে। নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে বা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর হস্তক্ষেপে তথ্য সংগ্রহ সাপেক্ষে প্রত্যেকটি উপজেলার অন্তর্কোন্দল এবং বিভাজনের সঠিক চিত্র উঠে আসবে বলে আশা করা যায়। 

আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় একজন নেতার সাথে কথা হলে তিনি টেলিফোনে বলেন, ‘উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের মধ্যে একটা বিভাজন তৈরি হয়েছে। আমরা তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। আশা করি, খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যে সকলের অন্তর্দ্বন্দ্বগুলো দূর করে সবাইকে এক কাতারে দাঁড় করাতে পারবো, ইনশাল্লাহ।’

লেখক: সাংবাদিক

ব্রেকিংনিউজ/এমআর

bnbd-ads