স্বপ্ন পূরণে অদম্য স্বপ্নিল

মো. ফয়সাল হক
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, সোমবার
প্রকাশিত: ১১:৪৮ আপডেট: ১১:১৩

স্বপ্ন পূরণে অদম্য স্বপ্নিল

সময়টা ছিল মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহ, (লকডাউনের আগে) অফিসে যাওয়ার সময় দেখছিলাম যে, কিছু দিন মজুর রাস্তার পাশে কোদাল, খুন্তি নিয়ে অসহায়ভাবে বসে আকাশের দিকে তাকাচ্ছে। কেউ তাদেরকে কাজের জন্য নিচ্ছে না। এই দৃশ্যটি আমার মনকে খুব নাড়া দেয় এবং তাদের জন্য কিছু করার চিন্তা আমার মাথায় ঘুরতে থাকে। পরবর্তীতে রাতে বাসায় এসে বিষয়টি আমি আমার স্ত্রী ও বন্ধুদের সাথে আলোচনা করি। প্রাথমিক ভাবে আমার ৫০০ টাকা ও আমার স্ত্রীর ৫০০ টাকা , মোট ১০০০ টাকা নিয়ে একটা প্ল্যান করলাম যে, কিছু নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য যেমন চাল, ডাল, আলু, সাবান, মাস্ক জিনিস গুলো দিয়ে প্যাকেট করে দিন মজুর, রিকশা চালক, ফেরিওয়ালা, গৃহপরিচারিকাদের মাঝে বিতরন করবো। কিছুক্ষণ পর আমার এই প্ল্যানটি ফেসবুকে পোস্ট করি এবং সবার কাছ থেকে ভাল সাড়া পেতে থাকি। আমার পোস্টটি দেখে, আমার ব্র্যাকের সাবেক এক সহকর্মী আসিফ ভাই সবার আগে উগান্ডা থেকে ৮০০০ টাকা পাঠায়। সেই ৫০০ টাকা থেকে আজ পর্যন্ত স্বপ্নিল ৭.৫০ লাখ টাকার কার্যক্রম আমরা সম্পন্ন করেছি।

প্রথমদিকে, আমরা ব্যক্তি উদ্যোগে কাজ করে আসছিলাম, পরবর্তিতে আমাদের এক দাতার পরামর্শে আমরা
আমাদের কার্যক্রমটিকে একটি সাংগঠনিক রুপ দেয়ার চিন্তা করি।সবার সাথে আলোচনা করে এপ্রিল ২০২০ থেকে আমরা স্বপ্নিল নামে আমাদের কার্যক্রম পরিচলানা করে আসছি।আমাদের স্বপ্নিল একটি রুপকল্প ; ক্ষুধা মুক্ত সবুজ পরিবেশে, প্রতিটি শিশু শিক্ষার আলোয় আলোকিত হবে; বাস্তবায়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। এই রুপকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য স্বপ্নিল চারটি মূল্যবোধে বিশ্বাস করে যেমন:
১. জাতি, ধর্ম, বর্ণ নিঃশেষে যার প্রয়োজন সবচাইতে বেশি, স্বপ্নিল তার জন্যই কাজ করবে।
২. সর্বাবস্থায় ব্যক্তিগত স্বার্থ ও প্রচার এড়িয়ে চলা।
৩. আর্থিক স্বচ্ছতা, পারস্পরিক বিশ্বাস ও সততা বজায় রাখা।
৪. দলীয় সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে কাজ করা।



প্রতিষ্ঠার পর থেকে স্বপ্নিল এই নিখুঁত মূল্যবোধকে অত্যন্ত দক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার সাথে বহন করার চেষ্টা করে চলেছে। দক্ষ স্বেচ্ছাসেবক, অর্থদাতাদের অনুদান, শুভাকাঙ্ক্ষীদের শুভ কামনায় স্বপ্নিল আম্ফান, বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে মহামারী অবস্থায় ১৭০০ পরিবারকে খাবার সরবরাহ করে তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে কাজ করে যাচ্ছে। এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য কিছু স্বপ্নবাজ তরুণের অবদান অপরিসীম, এদের মাঝে একজনের কথা না বললেই না, সে হল স্বপন, যিনি লকডাউনের সময়ে তার বাড়ির নিচতলা পুরোটাই স্বপ্নিলের কার্যক্রমের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়। এছাড়া সানি, তানভীর, নুর মোহাম্মদ, কানন, হিমেল, আবির, ঈদনান, হোসেন, ঈসা, রাতুল, মারুফ, শাউন, রাফসান, পাখি, ধীমান, সাদ্দাম, সুজন অত্যন্ত সততা ও দক্ষতার সাথে সবাই স্বপ্নিলের নিয়মিত কার্যক্রমের সাথে অতোপ্রোত ভাবে জড়িত। সমাজে সবচেয়ে অবহেলিত ও অসহায় মানুষের জন্য স্বপ্নিলে সর্বাধিক গুরুত্ব বিবেচনায় তার কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছে।

এক ঝাক তরুণ স্বপ্নবাজ স্বেচ্ছাসেবীর ঐকান্তিক প্রচেস্টা ও সর্বশক্তিমান আল্লাহর রহমতে স্বপ্নিল করোনা মহামারি
ছাড়াও ঘুর্নিঝড় আম্ফান, প্রলয়ংকারি বন্যার মত প্রাকৃতিক দুর্যোগে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে
গিয়েছে।স্বপ্নিলের জন্মলগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত প্রত্যক্ষ/পরোক্ষ ভাবে ২০০০ পরিবারকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে আসছে। গত সাত মাসে স্বপ্নিলের কার্যক্রমের সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হলোঃ

১. করোনা মহামারির সময়ে ঢাকার শনিড়আখড়া ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার ১২০০ পরিবারের মাঝে বিভিন্ন
পর্যেয়ে চাল, ডাল, তেল, আলু, সাবান, মাস্ক, চিনি, সেমাই, খেজুর, ছোলা ইত্যাদি নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রী
বিতরণ করেছে।
২. করোনা মহামারির সময়ে ১২টি মসজিদ ও একটি মন্দিরে জীবানু নাশক স্প্রে করা হয়েছে।
৩. পবিত্র ঈদ উল ফিতরে ৬০টি পরিবারের মাঝে রান্না করা খাবার বিতরণ করেছে।
৪. প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত সাতক্ষীরার উপকূলবাসীর ২০০টি পরিবারের মাঝে নিত্য
প্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করেছে।
৫. স্বপ্নপূরন পাঠশালার ৭০টি সুবিধা বঞ্চিত অসহায় শিশু বাচ্চাদেরকে মৌসুমি ফল খাওয়ানো হয়েছে।
৬. একজন প্রসূতি মায়ের আংশিক চিকিৎসা ব্যয় স্বপ্নিল বহন করেছিল।
৭. একজন বেকার অসহায় যুবকের পরিবারকে এক মাসের মুদি মালামাল কিনে দেয়া হয়।
৮. একজন প্রতিবন্ধীকে সাবলম্বী করার জন্য ২৫০০০ টাকার মালামাল কিনে দেয়া হয়।
৯. করোনা মহামারির সময়ে কিন্ডার গার্ডেন স্কুল ও মাদ্রাসার শিক্ষকদের মাঝে নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রী
বিতরণ করেছে।
১০. একজন মুমূর্ষু রোগিকে একমাসের ওষধ কিনে দেয়া হয়।
১১. পবিত্র ঈদ উল আযহায় ৪০ কেজি মাংশ সমাজের নিম্ন মধ্যবিত্তের মাঝে বিতরণ করা হয়। উল্লেক্ষ্য স্বপ্নিলের
দুজন দাতার পক্ষ থেকে দুটি খাসী কোরবানি করা হয়েছিল।
১২. কুড়িগ্রামের বন্যা কবলিত ২২২টি পরিবারের মাঝে নিত্য প্রয়োজনিয় খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করা হয়।
১৩. শেরপুরের নকলা উপজেলার একটি প্রতিবন্ধী শিশুকে হুইল চেয়ার দেয়া হয়।



তীব্র তহবিল সংকট থাকা সত্ত্বেও স্বপ্নিল আগামী দিন গুলোতে তার যে সব স্বপ্ন নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে:
১. দেশের উওরাঞ্চলে আগামী শীতকালে কম্বল বিতরণ।
২. স্বপ্নিলের কর্মসংস্থান প্রক্লপের আওতায় কিছু পরিবারকে ভ্যানগাড়ি, সেলাই মেশিন সহ নগদ মূলধন প্রদান।
৩. সবুজায়নের জন্য দেশের বিভিন জায়গায় বৃক্ষরোপন করা হবে।
৪. সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের জন্য স্কুল স্থাপন।
৫. আলোকিত মানুষ গড়ার জন্য একটি গ্রন্থাগার স্থাপন।
৬. সমাজের অবহেলিত প্রবীনঅদের জন্য বৃদ্ধাশ্রম নির্মাণ।

স্বেচ্ছাসেবীদের সততা-দক্ষতা, দাতাদের অনুদান, শুভাকাঙ্ক্ষীদের শুভ কামনা ও মহান রাব্বুল আলামিনের অশেষ রহমতে স্বপ্নিল সমাজের অবহেলিত মানুষের গুণগত পরিবর্তনের মাধ্যমে তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য কাজ করে যেতে চায়।

লেখক: প্রতিষ্ঠাতা ও কার্যকরি সদস্য

ব্রেকিংনিউজ/এমজি

bnbd-ads