করোনাকালীন কোরবানির ঈদ এবং আমাদের করণীয়

এ.আর.ইমরান
১৯ জুলাই ২০২০, রবিবার
প্রকাশিত: ১২:২৪ আপডেট: ১২:২৫

করোনাকালীন কোরবানির ঈদ এবং আমাদের করণীয়

করোনা মহামারিতে গোটা বিশ্ব আজ স্তব্ধ। থেমে গেছে স্বাভাবিক জীবনধারা, আগের মতো নেই মানুষের কোলাহল। ভেঙে গেছে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা। জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে পরিবহন-যোগাযাগও সীমিত করা হয়েছে। এক দেশের মানুষ অন্য দেশে বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া যাচ্ছে না, ভিসা জটিলতার কারণে চাইলেও যেতে পাচ্ছে না। এমনকি পাশের বাড়ি কিংবা পার্শ্ববর্তী এলাকাতেও আসা-যাওয়া সীমিত করা হয়েছে। সব মিলিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় বিশ্বজুড়ে থমকে গেছে জনজীবন। বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশেও নেমে এসেছে হতাশার আলো। এই হতাশার মাঝেই আসছে মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় অনুষ্ঠান ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ।

কোরবানির ঈদকে ঘিরে প্রতিবছরই পশু কেনাবেচা ও কোরবানির পশু পছন্দ করতে হাটে যাওয়াসহ নানা কারণেই প্রচণ্ড ভিড় ও ব্যাপক মানুষের সমাগম ঘটে হাটগুলোয়। ভিড় ঠেলে, রোদে পুড়ে, ঘেমে একাকার হতে হয় পশু কিনতে আসা মানুষকে। পাশাপাশি বিক্রেতাদেরও গরু-ছাগল নিয়ে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কয়েকদিন হাটে অবস্থান করতে হয়। ক্রেতা, বিক্রেতা এবং পাইকার সবকিছু মিলে অজস্র মানুষের মিলন মেলায় পরিণত হয় কোরবানির হাট। যদিও বাংলাদেশে করোনার  কমিউনিটি ট্রান্সফার অলরেডি হয়ে গেছে তবুও দেশের প্রত্যন্ত অনেক অঞ্চল আছে যেখানে করোনা বিস্তৃত ব্যাপকভাবে হতে পারেনি।

ঈদকে সামনে রেখে গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়াসহ অন্যান্য হালাল সকল শ্রেণির প্রাণী বাজারে তোলা হবে। এতে করে মানুষ থেকে পশু এবং পশু  থেকেও সাধারণ মানুষের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যাচ্ছে। করোনাকালীন সময়ে এপ্রিল এবং মে মাসে সাধারণ মানুষ সরকার নির্ধারিত যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি কিছুটা মেনে চললেও,  জুন এবং জুলাই মাসে তা নিতান্তই কম পরিলক্ষিত হয়েছে। পাশাপাশি প্রশাসনের যথাযথ উদ্যোগ এবং কড়াকড়ি আরোপ আগের চেয়ে অনেকটাই কমে গিয়েছে। সব মিলিয়ে একটা অনিশ্চিত আগামী আমাদের সকলের জন্য অপেক্ষা করছে। কবে? কখন? কিভাবে? আমাদের এই মহামারির পরিসমাপ্তি ঘটবে তাও আমাদের অজানা। কারণ আমরা যুদ্ধ করছি এমন একটি অদৃশ্য শক্তির সাথে, যাকে খালি চোখে দেখা যায় না। তাইতো সাধারণ মানুষ মৃত্যুর পরোয়া না করেই এগিয়ে চলছে সম্মুখ পানে। 
‘স্বপ্নের মাঝে স্বপ্ন তুমি 
আশার মাঝে হেলা
এভাবেই যাচ্ছে কেটে আমাদের সারাবেলা।’ 
স্বপ্নপূরণ অবশ্যম্ভাবী না হলেও আমাদের সম্মুখ পানে  এগিয়ে যেতে হবে। পরাজিত করতে হবে অদৃশ্য শক্তিকে। 

বরাবরের মতো এবারো করোনার মধ্যেও ঢাকাসহ সারাদেশে কোরবানির পশুর হাট বসবে৷ তবে স্বাস্থ্যবিধি যাতে মানা হয় সেদিকে কঠোর নজরদারি করা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। কোরবানির পশুর হাট বসিয়ে সামাজিক দূরত্ব বা  স্বাস্থ্যবিধি যাই বলি না কেন আদৌ কি তা মানানো সম্ভব? গত রোজার ঈদেও দোকানপাট খোলার সময় একই কথা বলা হয়েছিলো ৷ ব্যক্তিগত পরিবহণের নামে মানুষকে ঢাকা ছাড়ার সুযোগ করে দেয়া হয়েছিল ৷ যার পরিপ্রেক্ষিতে ঈদের পরে করোনার প্রাদুর্ভাবও বাড়তে শুরু করে৷ এবার খোলা মাঠে গরুর হাট বসানো হলে আরও বড় ধরনের সর্বনাশ হতে পারে বলে মনে করছেন অনেকেই। 

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, গ্রামীণ অর্থনীতির সাথে কোরাবানির পশুর হাটের একটা যোগ আছে৷ বাংলাদেশের চামড়া শিল্পও অনেকটা নির্ভরশীল কোরাবানির ওপরে৷ তাই দু’দিক রক্ষা করতে এবার কোরাবনির পশুর হাটের জন্য অনলাইন হাটের উপর জোর দেয়া হচ্ছে। 

যেভাবে বসার কথা এবারের পশুর হাট
এবার ঢাকার দুই সিটি মিলিয়ে পশুর হাট বসবে মোট ২৪টি৷ এরমধ্যে উত্তর সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ১০টি এবং দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকায় হবে ১৪টি৷ সারা দেশের জেলা উপজেলায়ও পশুর অস্থায়ী হাট বসানোর অনুমতি দেয়া হয়েছে৷ বাস্তবে অনুমোদনের বাইরেও কোরবানিতে আরো অনেক হাট বসে৷ সব মিলিয়ে এই হাটের সংখ্যা সারাদেশে পাঁচ হাজারের কম হবে না৷

পশুর হাট তদারককারী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষরা জানিয়েছেন,  কোরাবানির পশুর হাটের জন্য স্বাস্থ্য বিভাগ অতি দ্রুত একটি গাইডলাইন তৈরি করছে৷ সেটা চূড়ান্ত হলেই যথাযথভাবে অনুসরণ করেই পশুর হাট বসানো হবে ৷ এছাড়াও আমাদের নিজস্ব টিম এবং মোবাইল কোর্ট প্রস্তুত থাকবে যাতে স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব সঠিকভাবে মানা হয়।

আমাদেরকে করণীয় 
 --ক্রেতা-বিক্রেতা এবং পাইকারসহ সকলকেই অবশ্যই মাস্ক পরে পশুর হাটে প্রবেশ করতে হবে 
---হাচি, সর্দি, কাশি, জ্বর বা শ্বাসকষ্ট নিয়ে কেউ হাটে প্রবেশ করবে না।
---শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থরা হাটে আসতে পারবেন না।
----পশুর হাটে প্রবেশের আগে ও পরে তরল সাবান বা সাধারণ সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধুতে হবে।
----ক্রেতা এবং বিক্রেতা উভয়ের একটি করে হ্যান্ড স্যানিটাইজার রাখতে হবে (নাকি মুখে হাত দেয়ার আগে যেন সাথেসাথেই হ্যান্ড স্যানিটাইজ করতে পারে)।
---যতটুকু সম্ভব জনসমাগম এড়িয়ে, তিন থেকে ছয় ফিট সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করতে হবে।
----প্রশাসনিক চাপে নয় বরং স্বপ্রণোদিত হয়ে নিজে সকল স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পাশাপাশি অন্যকেও মেনে চলার পরামর্শ দিতে হবে।

আমাদের ভাবতে হবে বিশেষ করে যারা পূর্ব থেকেই কোন জটিল রোগে আক্রান্ত বয়স্ক ব্যক্তি, শিশু এবং হাই ব্লাড সুগার রোগীদের কথা। শিশুদের ক্ষেত্রে আক্রান্ত এবং মৃত্যুর হার যদিও একেবারেই কম তবু তাদেরকে সুরক্ষিত রাখতে হবে। 

বয়স্ক ব্যক্তিদের ইমিউনিটি সিস্টেম অল্প বয়সের লোকদের তুলনায় অনেক কম থাকে, তাই তাদেরকে বিশেষ যত্নে রাখতে হবে। আর যারা পূর্ব থেকেই জটিল কোন রোগে ভুগছে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সুস্থ মানুষের তুলনায় অনেক কম সুতরাং তাদেরকেও স্বাস্থ্যবিধির বাহিরে যেতে দেয়া যাবে না।

ডায়াবেটিসের রোগীদের এমনিতেই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে সুতরাং তাদের কেউ যথাযথ সতর্ক অবস্থায় থাকতে হবে।

ঈদ হলো আনন্দের, আত্মত্যাগের। প্রতিবছরের ন্যায় এবারের ঈদুল আজহা গতানুগতিক স্বাভাবিক ধারায় নেই। আমরা একটা অদৃশ্য অপশক্তির সাথে বসবাস করছি। যুদ্ধ করে চলছি প্রতিনিয়ত। শেষ পর্যন্ত এই অদৃশ্য অপশক্তিকে পরাভূত করেই বিজয় সুনিশ্চিত করতে হবে। এই লক্ষ্যে ঈদকে সামনে রেখে আমরা যেন পশুর হাটে প্রবেশের আগে এবং পরে সরকার প্রদত্ত সকল স্বাস্থ্যবিধি অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলতে পারি।

লেখক: সাংবাদিক

ব্রেকিংনিউজ/এমআর

bnbd-ads