মাঝারি ব্যবসায়ীদের সমস্যার সমাধান করবে কে?

এ,আর,ইমরান
১১ মে ২০২০, সোমবার
প্রকাশিত: ০৫:২২ আপডেট: ০৬:০৪

মাঝারি ব্যবসায়ীদের সমস্যার সমাধান করবে কে?

করোনা মহামারিতে গোটা বিশ্ব আজ থমকে গেছে। থেমে গেছে ঘুর্ণন গতি। ভেঙে গেছে আর্থিক ব্যবস্থা। বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশেও নেমে এসেছে মহাবিপর্যয়। দিন দিন বাড়ছে সংক্রমণ ও মৃত্যুর মিছিল। করোনা সংক্রমণের ৬১তম দিন অতিবাহিত হচ্ছে। দেশে এ পর্যন্ত (৮ মার্চ থেকে ১১ মে) ২৩৯ জন করোনার ছোবলে মারা গেছেন। আক্রান্ত হয়েছেন ১৫ হাজার ৬৯১ জন। মৃত্যুর এ মিছিল কোথায় গিয়ে থামবে- এ মুহূর্তে বলা মুশকিল?

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে সরকার দেশে গত ২৬ মার্চ থেকে দফায় দফায় সাধারণ ছুটি বাড়াচ্ছে। ষষ্ঠ দফায় ১৬ মে পর্যন্ত ছুটি চলছে। পরিস্থিতি ও বাস্তবতা বলছে, তা হয়তো আরও বাড়তে পারে। এতে করে মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত ব্যবসায়ীরা মূলত কর্মহীন হয়ে পড়েছে। অসহায় হয়ে পড়েছে এসব শ্রেণিপেশার মানুষ। উচ্চবিত্তদের কোনও অসুবিধা না হলেও নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা পড়ছেন চরম বিপাকে।

যদিও সরকার ব্যবসায়ীদের কথা বিবেচনা করে প্রথমে ৫ মে সকল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলে দিতে চেয়েছিল। পরবর্তীতে দ্বিতীয় দফায় তা ১০ মে থেকে শর্তসাপেক্ষে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার ঘোষণা আসে। দেশের এই ভয়াবহ সংক্রমণকালীন সময়ে সরকারের এমন সিদ্ধান্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার মুখে ব্যবসায়িক সংগঠনগুলো তাদের স্বীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয়। মূলত ৯৫% ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এমনিতেই বন্ধ হয়ে যায়। তাহলে আমরা ভেবেই  নিতে পারি যে, ঈদের আগে কোনও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ব্যাপকভাবে  খুলছে না (ইমার্জেন্সি সার্ভিস ব্যতীত)। 

মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত ব্যবসায়ীরা অধিকাংশই ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী। যেমন কাপড়ের দোকান, লেপ-তোষকের দোকান, মিষ্টির দোকান, টিন, চা, কসমেটিকস, হোটেল, স্বর্ণের দোকান, ফার্নিচার, কাঠের ব্যবসা, জুতার দোকান- এসব শ্রেণির ব্যবসায়ীদের গত ২৬ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত সকল দোকান বন্ধ রয়েছে। চলমান দুঃসময়ে কেউ কি তাদের খোঁজ নিয়েছে? নাকি কোনও ত্রাণ তারা পেয়েছে? অধিকাংশ ক্ষেত্রে কিছুই পায়নি তারা বরং দোকান ভাড়া, কর্মচারী বেতনসহ নিজের সংসারের খরচ যোগাতে গিয়ে  হিমসিম খেয়ে হচ্ছে এসব সীমিত পুঁজির ব্যবসায়ীদের। জীবনের একান্ত প্রয়োজনে কোনও উপায়ান্তর না থাকায় কেউ কেউ দোকানের একাংশ খোলা রাখছে শুধুমাত্র মৌলিক চাহিদা মিটাতে কিছু অর্থের যোগান দিতে। যদিও এটা আইনের পরিপন্থি, তবুও তারা অসহায়। এই অসহায় মানুষগুলোকে দোকানের একাংশ খোলার জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অর্থদণ্ডসহ বিনাশ্রম কারাদণ্ডও দেয়া হচ্ছে কোথাও কোথাও। তারা ভাঙবে, কিন্তু মচকাবে না। কষ্টে তাদের বুক ফেটে গেলেও মুখে কিছু বলবে না- এরই নাম মধ্যবিত্ত। 

তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে অনুরোধ করবো, মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত ব্যবসায়ীদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা অথবা আপৎকালীন কিছু জরুরি রুলস অ্যান্ড রেগুলেশন নির্ধারণ করে দিতে। 

মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত ব্যবসায়ীদের ব্যবসার পরিধি খুব বেশি একটা বড় না হলেও তারা বিভিন্ন সোর্স থেকে টাকা সংগ্রহ করে ব্যবসা পরিচালনা করে থাকেন। যেমন ব্যাংক লোন, এনজিওর  লোন, দাদন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে উচ্চ সুদে টাকা অথবা নিকটাত্মীয় থেকে টাকা সংগ্রহ করে তারা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে থাকেন। তাছাড়াও হোলসেল মার্কেট থেকেও বাকিতে মালামাল সংগ্রহ করে থাকেন। যেহেতু গত ২৬ মার্চ থেকে তাদের সকল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে সেহেতু তারা কোন ধার-দেনা পরিশোধ করতে পারেনি। তার উপর বাড়ি ভাড়া, দোকান ভাড়া, কর্মচারীর বেতন সহ অন্যান্য দেনা তো রয়েই গেলো।  

এমতাবস্থায় মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত ব্যবসায়ীদের সমস্যার সমাধান কে করবে? আমি মনে করি সরকারের আন্তরিকতা এবং যুগোপযোগী সিদ্ধান্তই পারে মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত ব্যবসায়ীদের বাঁচাতে। 

এক্ষেত্রে কিছু পদক্ষেপের মধ্যে হতে পারে-
১) ব্যাংক লোনের সকল কিস্তি ৬ মাসের জন্য স্থগিত করে।
২) কোনও প্রকারের লভ্যাংশ ছাড়াই পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে পূর্ববর্তী ৬ মাসের সুদমুক্ত আসল টাকা প্রদানের ব্যবস্থা করে 
৩) এনজিও এবং  সমিতির লোনের ক্ষেত্রেও একই আইন বলবৎ করে।
৪) দোকান ভাড়া, বাড়ি ভাড়া, ৩ মাসের জন্য স্থগিত করে পরবর্তী ৩ মাসের মধ্যে পূর্ববর্তী ৩ মাসের বাড়ি ভাড়া প্রদান করার ব্যবস্থা করে।
৫)বাড়ি ভাড়ার উপর নির্ভর করে যাদের সংসার চলে সেই সকল বাড়ির মালিক কে অর্ধেক ভাড়া প্রদানের করে  বাকি টাকা পরবর্তী ৩ মাসের বাড়ি বাড়ার সাথে প্রদান করার ব্যবস্থা করে।
৬) এছাড়াও স্বল্প সুদে ব্যাপকভাবে ব্যাংক ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
৭)করোনা সংকটকালীন সময়ে ৬ মাসের মধ্যে যেন কোন চেকের মামলা আদালত গ্রহণ না করে ।  উল্লেখ্য যে  দাদন ব্যবসায়ীরা ব্লাঙ্ক চেক এর বিনিময়ে উচ্চ সুদে ব্যবসায়ীদের টাকা প্রদান করে থাকেন। 

তাহলে মধ্যবিত্ত এবং নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির ব্যবসায়ীরা কিছুটা হলেও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারবে। সংকটকালীন সময়ের পরবর্তী ৬ মাস তারা যদি সঠিকভাবে তাদের ব্যবসা পরিচালনা করতে পারে তাহলে তারা অনেকাংশেই ঋণ সহ অন্যান্য দেনা পরিশোধ করতে পারবে বলে আমি মনে করি। 

যদিও সরকার ইতোমধ্যে স্বল্প সুদে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ব্যাংক ঋণ প্রদানের অ্যালাউন্স করেছেন, তবুও সকল ব্যবসায়ী এই ঋণ গণহারে পাবেন না। তাই সরকারকে অনুরোধ করবো, মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত ব্যবসায়ীদের বাঁচাতে উপরোক্ত পদক্ষেপগুলো বিচার-বিশ্লেষণ করে একবার  ভেবে দেখবেন আশা করি।

লেখক: সাংবাদিক

ব্রেকিংনিউজ/এমআর

bnbd-ads