চোখ ভিজে যায় দৃষ্টির সীমানায়

মো. মাহমুদুল হাসান
১৪ এপ্রিল ২০২০, মঙ্গলবার
প্রকাশিত: ০১:৩৪

চোখ ভিজে যায় দৃষ্টির সীমানায়

চলতি মাসের শুরুতে নতুন বাসায় উঠেছি। নির্মাণাধীনবাসা। বাড়িটি বেশ গুছানো। অবকাঠামোও মজবুত। বাড়িটি শহরের শেষ প্রান্তে হওয়ায় পর্যাপ্ত খোলা জায়গা আছে। তাতে মুক্ত বাতাস ও গ্রামের পরশ মিশে আছে। এখানে মাত্র তিনটি পরিবারের বসবাস। বিদ্যুত, পানি- গ্যাস সার্বক্ষণিক। আধুনিকমানের বাসা হওয়ায় প্রকৌশলী বাড়িটির প্রতিটি রুমের পাশে বারান্দা রেখেছেন। বলতে গেলে জমিয়ে সময় কাটানো যায়। 

গত ২৪ মার্চ থেকে বাসায় বসে রোস্টার মতো অফিসের কাজ করছি। আগে অফিস থেকে বাসায় ফেরার জন্য মনটা উতালা হয়ে থাকতো। এক ঘণ্টা আগে কাজ শেষ করতে পারলে কতো আনন্দ লাগতো। আর এখন? এ যেন কষ্টের মধ্যে নিজেকে বাসায় বন্দি রাখা। কবে ঘর থেকে ছাড়া পাবো জানি না। সারা বিশ্বে কবে শান্তি আসবে জানা নেই। মাঝে একদিন অফিসের কাজে বের হয়েছিলাম। রাজধানীর সড়ক ফাঁকা। জনশুন্য। অফিস বিল্ডিংয়ের নিচে কুদ্দুসের চায়ের দোকান সেটিও বন্ধ। তার পাশে রহমত চাচা ফ্লাক্সে চা, পান আর সিগারেট নিয়ে সকাল থেকে বসে আছেন। তার কোনটাই বিক্রি হয় না। গত ১৫ দিন ধরে যখনই রাজধানীর সড়ক দেখি, বুকটা কেঁপে ওঠে। একি হলো! কবে আবার স্বাধীনভাবে চলতে পারবো।

বাসায় বসেই শবে বরাত পার করলাম। মাহে রমজান আসছে। মহল্লার মসজিদে আজান হয়, যেতে পারি না। জুম্মার নামাজে না যাওয়ার জন্য মসজিদ থেকে নিষেধ করা হয়। পরিবারের কয়েকজন প্রবাসে থাকেন। তাদের চিন্তায় ঘুমানো দায়। তাদের কথা ভাবলে, ছটফট লাগে।

এমন দমবন্ধ জীবন কখনো আসেনি। টিভি খুললেই মৃত্যু সংবাদ। পত্রিকায় একই খবর। ইতালিতে এতো, স্পেন, বেলজিয়াম, যুক্তরাষ্ট্রে, সারা বিশ্বে মৃত্যুর সংখ্যা অনেক আগেই লাখ ছাড়িয়ে গেছে। মৃত্যু আর লাশ ছাড়া অন্য কিছু নেই সারা বিশ্বে। আগামীতে কী হবে এমন ভাবার সময় নেই। কীভাবে বাঁচবো- এটাই এখন প্রধান বিষয়। অনেকে অনেক কথা বলছেন। সেগুলো শুনে মনটা বড্ড খারাপ হয়ে যায়।

বাসার সামনের বিল্ডিংয়ে রোজ সকাল, বিকেলে এক শিশুকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। পাশে থাকে খেলনা। মায়ের ওরনা দিয়ে বারান্দার রেলিংয়ে বাঁধা দোলনা। শিশুটি চুপচাপ থাকে। বারান্দার গ্রিল ধরে তাকিয়ে থাকে বাইরে। তার মা মজার মজার লোভনীয় অফার দেয় শিশুকে। তাতেও কোন সাড়া দেয় না। ঘুরে তাকায় না। চোখে তার আনন্দ খেলে যায় না। বড়রাই ঘরে থাকতে পারেনা সেখানে তো একটা শিশু! তারও মন চায় বাইরে যেতে। কিন্তু উপায় কি! সবখানেই যে করোনা তার বিষ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখেছে। কবে থামবে সে নিজেও জানে না। বাবা মাও নিরুপায়। বাইরে বেরুলে যদি করোনায় ছুঁয়ে যায়!

করোনার ভয়াল থাবায় বিশ্ব আজ থমকে গেছে। হারিয়েছে তার নিজস্ব গতি। বিশ্ব সভ্যতা আজ এক চরম পরীক্ষায়! এমন বিভীষিকাময় ময়দান দেখেও ভয় পায়না কিছু মানুষ নামের অমানুষ। ত্রাণ দেয়ার কথা বলে ডেকে এনে দিনমজুরের মেয়েকে ধর্ষণ করেছে এক জনপ্রতিনিধি। হাসপাতালে ভর্তি না নেয়ায় রাস্তায় সন্তান প্রসব করেছেন একজন মা। লাশ বহনে মসজিদের খাটিয়া না দেয়ায় খালি কাঁধে কাফনে আবৃত মরদেহ বহন করে দাফন করেছে বাবা-ভাইয়েরা। ফুসফুসে ক্যান্সার আক্রান্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুমন চাকমাকে করোনার রোগী ভেবে কোন হাসপাতাল চিকিৎসা দিতে রাজি হয়নি। হোমিও চিকিৎসকের ওষুধ খাওয়ার ২৪ দিন পর মৃত্যুরর কাছে হেরে গেলেন সুমন চাকমা।

করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রধান সরঞ্জাম পিপিই, মাস্ক ও করোনা টেস্টিং কীট এর হাহাকার। এসব খবর বলে দিচ্ছে লাগামহীন লোভ আর স্বার্থপরতার দাসত্বে বন্দি অনেকের মনুষ্যত্ব। ভয় জাগানো খবর মুহূর্তে মুহূর্তে। মৃত বা আক্রান্ত। সরকারি হিসাবে একরকম। বেসরকারি হিসাবে আরেক রকম।

এমন দুর্যোগ মুহূর্তে লকডাউন ভেঙে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে হাতে কাটা পা নিয়ে মিছিল করছে অমানুষের দল। মুখে আবার জাতীয় স্লোগান জয়বাংলা। এর আগে এরাই প্রতিপক্ষ একজনের পা ধারালো অস্র দিয়ে কুপিয়ে কেটেছে। এতেও সন্তুষ্ট নয়, মিছিল থেকে একজন বলছে, এভাবেই কেন মাথাটা কেটে আনা হলো না। মাথাটা কেটে আনলে সেটা হাতে নিয়ে মিছিল করা যেতো! অন্যরা বাপের বেটা বলে প্রশংসা করত।

গতকালই ভোলার লালমোহনে এক ইউপি সদস্যের বাড়িতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী আবিষ্কার করেছে চালের খনি। মাটি খুঁড়ে তা উদ্ধারও করা হয়েছে। শুধু ইউপি সদস্যের বাড়িতে নয়, চৌকিদারের বাড়িতেও এমন খনি পাওয়া গেছে। দেশের কয়েক জায়গা খাবারের জন্য ক্ষুধার্ত মানুষ মানববন্ধন করেছে। এরমধ্যে এক বুদ্ধিমান ইউপি চেয়ারম্যান প্রশাসনের ভয়ে চুরি করা চাউলের বস্তাগুলো পুকুরে ফেলে দিয়েছেন।

ঘরবন্দি মানুষের যত দিন গড়াচ্ছে ততো চোখ মুখ কালো হয়ে আসছে। দরিদ্রদের অবস্থান হবে অনুমানের বাইরে। পেট ঠেকে যাবে হয়তো পিঠে। কি করবে তারা! একই সঙ্গে তাড়া করছে ঋণের বোঝা। সরকার হয়তো তিন মাসের জন্য কিস্তি স্থগিত করেছে। মওকুফতো করেনি। পরবর্তী সময়ে চেপে বসবে ঋণের বোঝা। বাকি সময়ে সে ঋণের হাত থেকে মুক্তির পথ কী!

দেখতে দেখতে ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টিয়ে বাংলা বছর শেষ হয়ে গেল। ভোরের সূয্য উঠার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হবে বাংলা নববর্ষ ১৪২৭। পহেলা বৈশাখে নেই উন্মাদনা। নেই কোন বাহারি প্রতিযোগিতা। আছে শুধু করোনা আতঙ্কের মধ্যে বেঁচে থাকার প্রতিযোগিতা। এভাবে শেষ হবে দিন, মাস, বছর। তরপার এ যাত্রার শেষ কোথায়? 

করোনা মহামারীর কারণে পহেলা বৈশাখ পালন এবার একটু ব্যতিক্রমী হচ্ছে। তবে ডিজিটাল বাংলাদেশে বৈশাখের মূল কিছু আয়োজন দেখা যাবে অনলাইনে। তবে লোকসমাগম না করার জন্য সব অনুষ্ঠানেই থাকছে বিশেষ প্রচেষ্টা।

সবশেষে বলতে ইচ্ছে করে মানুষ বাঁচে আশায়। আশা নিয়েই তার পথ চলা। বিশ্বাস করি একদিন হয়তো ঝড় থেমে যাবে। পৃথিবী আবার শান্ত হবে। সেই কামনায় নিখিল বিশ্বের মালিক আমাদের সবাইকে মাফ করুক। বিশ্বব্যাপী এই দুর্যোগ কাটিয়ে উঠার শক্তি আমাদের দান করুন।

লেখক: গণমাধ্যম কর্মী

ব্রেকিংনিউজ/এমএইচ

bnbd-ads