অতঃপর মহাসংকটের সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ

মো. মাহমুদুল হাসান
১০ এপ্রিল ২০২০, শুক্রবার
প্রকাশিত: ০৯:২৮ আপডেট: ০৬:০০

অতঃপর মহাসংকটের সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ
ছবি: প্রতীকী

মহামারি করোনা ভাইরাসে গোটা পৃথিবী আজ স্থবির হয়ে গেছে। করোনা আতঙ্কে গোটা বিশ্ব আজ ঘরবন্দি। ইউরোপ-আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের কিছু কিছু দেশ এরইমধ্যে ‘মৃত্যু উপত্যকা’ হয়ে উঠেছে। প্রাণ সংহারি এই মহামারি বাংলাদেশের দিকেও ধেয়ে আসছে আজ। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও সরকারের দেয়া নির্দেশনা যেন অনেকটাই মানতে নারাজ তথাকথিত আড্ডাপ্রিয় বাঙালি। এসব ব্যাপারে সরকারের কঠোরতার ফাঁকফোকড় আর সাধারণ মানুষের আত্মোপলব্ধির অভাব পুরো দেশকে আজ অজানা মহাসংকটের মুখোমুখি করেছে। 
 
এইতো ক’দিন আগেই গণমাধ্যম ও সোস্যাল মিডিয়ায় একটি খবর চাউর হয়। ঘটনাটি ছিল এমন। করোনা ভাইরাস সংক্রমিত হয়ে এক প্রবাসী হাসপাতাল থেকে পালিয়েছেন শুনে চারজন যুবক তাকে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ল। নানা জায়গায় খোঁজাখুঁজির পর অবশেষে তাকে তার শ্বশুরবাড়িতে পেল। জোর করে ওই প্রবাসীকে চারজন বন্ধু মিলে তাদের কাঁধে করে তুলে এনে আবারও হাসপাতালে ভর্তি করাল। এ খবর আর কাঁধে তোলার ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ায় এ এলাকা ও আশপাশের এলাকা থেকে প্রায় চার-পাঁচশ’ মানুষ এসে ওই চারজন বন্ধুকে দেখতে লাগল। সবাই ওই চার যুবকের সঙ্গে সেলফি-ছবি তুলে তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে, শরীর ও হাতে ধরে বীরত্বের জন্য বাহবা দিয়েছে। অসচেতন, অসতর্ক থাকায় অতি আবেগ-উল্লাসের কারণে একজন করোনা ভাইরাস রোগী থেকে ওই এলাকা এবং তার আশপাশের মানুষও কভিড-১৯ এ সংক্রমিত হয়েছে। ।
 
আজ বিশ্বের ৭০০ কোটি মানুষের মনে একটাই প্রশ্ন, কবে শেষ হবে এ করোনা ভাইরাস মহামারি? কয়েকটি দেশ সম্পূর্ণ লকডাউন অবস্থায়। সৌদি আরব দুটি বাদে বাকি সব মসজিদে নামাজ পড়া বন্ধ করেছে। অন্যান্য দেশের ন্যায় বাংলাদেশের পরিস্থিতিও খুব দ্রুত বদলাচ্ছে। অনেকেই আশা করেছিলেন যে, বাংলাদেশ হয়তো করোনা মোকাবিলা করতে পারবে। করোনা প্রতিরোধে বাংলাদেশ শুরু থেকেই প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিল। কিন্তু সমন্বয়হীনতা এবং কিছু মারাত্মক ভুলের কারণে বাংলাদেশ এখন পুরোপুরিভাবেই করোনা ঝুঁকিতে পড়েছে। করোনা মহামারি রূপে বাংলাদেশের দিকে এগিয়ে আসছে।
 
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যদিও আগেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় করোনা মহামারির আশঙ্কার কথা বলেছিল। কিন্তু তারপরও আমরা আশা করেছিলাম নানা কারণে বাংলাদেশে হয়তো করোনার ব্যাপক বিস্তার হবে না। কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদফতর যে তথ্য দিয়েছে সেই তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে যে, খুব বড় কোনো ব্যতিক্রম না ঘটলে আমরা করোনা মহামারির ঝুঁকির মধ্যে প্রবেশ করতে যাচ্ছি। এটা সময়ের ব্যাপার মাত্র। এক্ষেত্রে আমাদের ভুলগুলো কী ছিল, সেটা আমরা একটু দেখে নেই।
 
জনসচেতনতার অভাব
আমাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা সরকারের পক্ষ থেকে অনেক ধরনের সচেতনতা কার্যক্রম চালানো হলেও করোনার ভয়াবহতা সম্পর্কে সাধারণ মানুষ সচেতন হয়নি।  এর একটা বড় কারণ ছিল যে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের করোনা নিয়ে যে প্রচার প্রচারণা তা ছিল সংবাদপত্র-কেন্দ্রিক। সংবাদপত্রই এখন এক সংকটের মধ্যে পড়েছে, পাঠকশূন্যতার কারণে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং টেলিভিশনে প্রচার প্রচারণা ছিল একেবারেই সীমিত। যার কারণে করোনা মোকাবিলার ক্ষেত্রে আমাদের সাধারণ মানুষকে সরকার সচেতন করতে পারেনি। সাধারণ মানুষের মনে এই রোগের ভয়াবহতা এবং এই রোগের সংক্রমণের বিষয়ে যথেষ্ট স্পষ্ট ধারণা তৈরি হয়নি। যে কারণে তারা ছুটির সময় ঘরে থাকার বদলে চায়ের আড্ডায় এবং নানা জায়গায় ঘুরে বেরাচ্ছে। বাজারে যাচ্ছে। সামাজিক মেলামেশাও চলছে প্রায় যথারীতি।
 
বিদেশফেরতদের যথাযথভাবে বিচ্ছিন্ন করতে না পারা
করোনা ঝুঁকি নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে কয়েক লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি গত কয়েক মাসে দেশে ফিরেছে। কিন্তু শুরু থেকে বিদেশফেরতদের যথাযথভাবে বিচ্ছিন্ন করতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। বাংলাদেশে করোনা এসেছে বাইরের দেশগুলো থেকে। বিশেষ করে ইতালি, ইউরোপ থেকে যখন মানুষ বাংলাদেশে ফেরা শুরু করে তখনই করোনার বিস্তার শুরু হয়। ওই সময়গুলোতে বিদেশফেরতদের বিচ্ছিন্ন করা এবং ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইন কঠোরভাবে সরকার নিশ্চিত করতে বলা যায় ব্যর্থই হয়েছে। আর এই ব্যর্থতারই খেসারত হিসেবে এখন প্রতিদিন দেশে আক্রান্তের হার বাড়ছে, দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল।
 
সামাজিক সম্মিলনের জায়গাগুলো বন্ধ করতে না পারা
ধর্মীয় স্পর্শকাতর এই বিবেচনা থেকে আমরা শুরু থেকে বাংলাদেশের মসজিদে জামাতে নামাজ বন্ধ করতে পারিনি। অনেক সামাজিক সম্মিলনের জায়গা যেমন- বাজার-হাট ইত্যাদিও বন্ধ করা যায়নি। এমনকি অতি উৎসাহী কেউ কেউ ত্রাণ বিতরণের নামে সম্মিলন ঘটিয়েছে, যা ছিল আরেকটি বীভৎসতা। এসব কারণেই আমরা সামাজিক বিচ্ছিন্নতা প্রতিপালন করতে পারিনি। এটি আরেকটি বড় ব্যর্থতা।
 
শহরতলীতে নজরদারির অভাব
ঢাকায় কদাচিৎ কিঞ্চিত দেখা গেলেও সারা দেশের বিভিন্ন শহরাঞ্চলগুলোতে করোনা মোকাবেলার ক্ষেত্রে শুরু থেকে কঠোর নজরদারি বলবৎ রাখা যায়নি। অলিতে গলিতে চায়ের দোকানে মানুষের যে মেলামেশা, এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে যাওয়া, সেগুলোও বন্ধ হয়নি। প্রয়োজনীয় সামাজিক বিচ্ছিন্নতাও সময়মতো আমরা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছি।
 
সরকারের কিছু ভুল সিদ্ধান্ত
আজকে দেশে করোনা ভাইরাসের যে পরিস্থিতি বিরাজমান তার সবশেষ কারণটা সরকারের কিছু ভুল সিদ্ধান্ত। বাণিজ্যমন্ত্রীর গার্মেন্টস খোলার সিদ্ধান্তটা ছিল একটা আত্মঘাতী এবং চরম ভুল সিদ্ধান্ত। এছাড়াও ২৪ তারিখে যখন ছুটি ঘোষণা করা হলো, তার সঙ্গে সঙ্গেই পরিবহন বন্ধ করার দরকার ছিল, কিন্তু ছুটি ঘোষণার আগেই। উল্টো সাধারণ ছুটির পরদিন যখন গণপরিবহন বন্ধ করা হলো, ততক্ষণে মানুষ ঝাঁকে ঝাঁকে ঢাকা ছাড়া শুরু করেছে। এই যে বিভিন্ন যানবাহনে ব্যাপক হারে মানুষের ঢাকা ত্যাগ সেটাও করোনা সংক্রমণের ঝুঁকিকে কয়েকগুণ বাড়িয়েছে। আবার বাণিজ্যমন্ত্রীর গার্মেন্টস খোলার অতি উৎসাহী সিদ্ধান্তে ছুটির আমেজে কিংবা সংক্রমণ ঝুঁকি এড়াতে গ্রামে ফেরা সামান্য চাকুরির এই মানুষগুলো যেকোনও উপায়ে আবারও গণপরিবহন উপেক্ষা করে শত শত মাইল পায়ে হেঁটে চাকরি বাঁচাতে ঢাকামুখি হয়েছে। যা করোনার সংক্রমণ ঝুঁকিকে করেছে লাগামছাড়া।
 
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এখনও আমাদের সময় আছে। যারা সংক্রমিত হয়েছেন তাদের যদি আমরা দ্রুত পরীক্ষা করতে পারি, সামাজিক সংক্রমণের ক্লাস্টারগুলোকে যদি আমরা আলাদা করতে পারি এবং যদি আমরা এই ছুটির মেয়াদ আরও বাড়িয়ে মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে রোগীদের সঙ্গে যারা মিশেছেন তাদেরকে চিহ্নিত করতে পারি, তাহলে হয়তো শেষ সুযোগটি কাজে লাগানো যেতে পারে। তবে এটাও নিশ্চিত- এর জন্য শুধু সরকারকে কঠোর হলে হবে না, আমাদেরও হতে হবে সচেতন এবং অনেক বেশি দায়িত্বশীল। দেশ ও জাতির এই ঘোর ক্রান্তিলগ্নে এমনটিই তো প্রত্যাশিত।
 
লেখক: সাংবাদিক

ব্রেকিংনিউজ/এমআর

bnbd-ads