এই ছুটি আমি চাইনি

মো. রাকিবুল হাসান
২৬ মার্চ ২০২০, বৃহস্পতিবার
প্রকাশিত: ০৫:৩৪ আপডেট: ০৫:৪০

এই ছুটি আমি চাইনি

ক্যাম্পাস বন্ধ। ঘোরাঘুরি, খেলাধুলায় মানা। বাড়ি থেকে বের হওয়ায় বারণ। তবে এই ছুটিতে আমি কি করবো? সারাদিন বাড়িতে এক মুঠোফোন। গান, নাটক, মুভি আর ভাল লাগছে না। সবকিছুতেই বারণ, নিজেকে বন্দি লাগছে।

১৬ মার্চ ছুটির বিজ্ঞপ্তির অপেক্ষায় বসে ছিলাম। বাড়িতে যাবো, বাড়িতে গিয়ে সব খেয়ে ফেলবো। প্রচুর ঘুমাবো। বেশ কয়েকদিন বিশ্রাম করবো। এই কয়দিন ক্লাস-পরিক্ষার কোনো প্যারা থাকবে না। বাড়িতে গিয়ে এটা কিনবো, ওটা নিবো। কত্ত কিছুই ভেবেছিলাম।

তবে আজ খুব ছন্নছাড়া মনে হচ্ছে। বন্দি লাগছে নিজেকে। এই পরিস্থিতি থেকে কবে ছুটি পাবো? সেই অপেক্ষায় দিন পার করছি এখন...

ফাঁকা মাঠ পড়ে আছে। কেউ খেলতে আসে না। কেউ আসে না করোনার ভয়ে কেউবা পুলিশ, সেনাবাহিনীর ভয়ে। বন্ধুরা বাহিরে বের হয় না। ঘোরাঘুরি করারও উপায় নেই। ক্যাম্পাস বন্ধে নিয়মিত পড়াশোনাও করতে খুব একটা ইচ্ছে করে না।

প্রত্যেকদিন কষ্ট করে হলেও ঘুম থেকে জাগি বেলা গড়িয়ে দুপুর হওয়ার পর। ওঠে খেয়ে বাহিরে যাই একবার। আবার বাড়িতে চলে আসি। গান, নাটক, মুভি দেখি। কিছু সময় পর আর ভালো লাগে না। আবার গোসল করে খেয়ে বাহিরে যাই।

বাহিরেও করা মতো কিছু নেই। অহেতুক বাহিরে থাকাও নিষেধ। বন্ধুরা একাকী সময় কাটায় বাড়িতে। সন্ধ্যা থেকে মুঠোফোনে ফেসবুক, ইউটিউব করতে করতে মধ্যরাত হয়ে যায়। খেয়ে আবার সেই ফোন নিয়েই বিছানায় গড়াগড়ি খাই।

করোনাভাইরাস শঙ্কায় সুস্থ ও নিরাপদ থাকার জন্য আমরা বাড়িতে থাকছি। এতে আমরা নিরাপদ থাকছি ঠিকই তবে অনেকটা সময় হারিয়ে ফেলছি। করোনায় বাঁচতে চার দেয়ালে আটকে থেকে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে যাচ্ছে অল্প বয়সীদের।

আমরা জানি, একজন মানুষ টানা ২১ দিন ধরে, কোনো কাজ করলে, তাতে সে অভ্যস্ত হয়ে যায়। আমরা এভাবে ঘরে বসে থাকতে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি। অলসতা ভর করছে আমাদের দেহে ও মনে। চার দেয়ালের মধ্যে একাকী অলস সময় কাটানোও এক সময় ভাল লাগবে। তখন করোনার ছুটি হয়ে যাবে। তবে ছুটি পাবো না আমরা এই অলসতা থেকে।

এই তো! কিছু দিন আগের কথা। সকাল সকাল ঘুম থেকে ওঠার জন্য পরপর তিনটি এলার্ম দিতে হতো। একটু দেরি হলেই হয় অ্যাটেন্ডেন্স মিস। নইলে বকা খাও টিচারের। সকালে খাবার খাওয়ার ফুসরত নেই।সকালের খাবার খেতে খেতে দুপুর দুটো।

ক্লাস শেষে ঘরে ফিরতে বিকাল। ঘরে ফিরে বিশ্রাম করার সুযোগ নেই বললেই চলে। টিউশনি করাতে হবে দুইটা। রাত অাটটা নয়টায় ক্লান্ত দেহ নিয়ে ঘরে ফেরা হয়। বিশ্রাম নিয়ে আবার পড়তে বসা, অ্যাসাইনমেন্ট করো, এই শীট পড়ো, কাল পরিক্ষা, পরশু মিডটার্ম। পড়তে পড়তে রাত ২টা বেজে যায়। এর মধ্যেই রাতে খাওয়া শেষ।

এখন একটু শুয়ে পড়লাম। ফেসবুক, ইউটিউব না দেখলে ঘুম ঠিকমতো হয় না। এসব করতে করতে কখন যে তিনটা চারটা বেজে যায় বুঝতেই পারি না। কিন্তু তখনো চোখে একটুও ঘুম নেই। এই তো দুপুরে, সন্ধ্যায় ঘুমে নড়তে পারছিলাম না। সকালে ঘুম থেকে ওঠতেও প্যারা হবে। তবে এখন ঘুম আসবে না....

এভাবেই দিনের পর দিন কেটে যায়। এই মাসের প্রথমে বেশ শরীর খারাপ করেছিল। জ্বরে বিছানা থেকেই ওঠতে পারছিলাম না। ক্লাসেও যেতে পারিনি। টানা তিন দিন পর বিছানা থেকে ওঠে ছিলাম। তারপর আর ক্লাস করতে ইচ্ছে করছিল না। ভাবতাম যদি কয়েক দিনের ছুটি পেতাম বাড়িতে ঘুরে আসতাম। কিন্তু ছুটি নেই, সামনের সপ্তাহ থেকে টানা মিডটার্ম পরীক্ষা। বাসায় যাওয়ার উপায় নেই।

দুদিন না যেতেই বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগীর মৃত্যু ঘটলো। আমাদের দেশে তখন আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় চার পাঁচ জন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ ঘোষণা করা হল। তখন খুশি তে ব্যাকুল হয়ে গেলাম। তবে আমার স্টুডেন্ট দুইটা এইচএসসি পরীক্ষার্থী। ছুটি তো প্রায় সপ্তাহ দুয়েকের মত। বাড়িতে তিন চার পরেই যাই। ওদের বইটা গুছিয়ে দেই।

স্টুডেন্টরা বললো, 'ভাইয়া আমাদের পরিক্ষা পিছাবে নাহ? আমাদের প্রবেশ পত্রও তো দেয়নি।' 'হুম... দেখো পেছাতে পারে। তবে নিশ্চিত করে বলা যায় না, পড়তে থাকো।' 'ভাইয়া পিছালে ভাল হবে৷ কত দিন পিছাবে? এক মাস নাকি ঈদের পর হবে? পিছালে আরো বেশি পড়তে পারবো।' 'জানি না, দেখো কি হয়!'

সেই শেষ পড়িয়ে বাড়ি আসলাম। প্রথম দুইদিন প্রচুর খেলাম, ঘুমালাম। অনেক আনন্দ লাগছিল। অনেক দিন পর একটু ব্যস্ততা থেকে মুক্তি পেয়েছি। তবে, এখন এই অলস বন্দী চার দেয়াল থেকে মুক্তি পেতে চাই। অতিদ্রুত ব্যস্ততার ক্যাম্পাসেই ফিরে যেতে চাই আবার। আগামীকাল যেন ঘুম ভেঙ্গে শুনি, করোনা থেকে গোটা বিশ্বের মানুষ মুক্তি পেয়েছে। সব কিছু স্বাভাবিক হয়ে গেছে।

মক্কা মদিনার মসজিদে আযান হচ্ছে। সকলে স্কুলে যাচ্ছে, মাঠে খেলছে। ঘোরাঘুরিতে ব্যস্ত যুবক যুবতীরা। করোনা বিদায়ে চারদিকে উৎসব ছড়িয়ে পড়েছে। এখন এ স্বপ্ন দেখেই ঘুমিয়ে পড়ি প্রতি ভোররাতে।

ব্রেকিংনিউজ/এমজি

bnbd-ads