করোনা, মসজিদ ও জামাআত: তিনটি কথা

জাকারিয়া মাসুদ
২৪ মার্চ ২০২০, মঙ্গলবার
প্রকাশিত: ১১:৫৫

করোনা, মসজিদ ও জামাআত: তিনটি কথা

১. ফেইসবুক সেলিব্রেটিদের জন্যে

কলাবিভাগের যারা বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে নাক গলায়, অনেকেই তাদের কলাবিজ্ঞানী নামে ডাকেন। যারা ডাকেন তাদের দাবি হলো : বিজ্ঞান-বিষয়ে বিজ্ঞানীরা নাক গলাবে। আর অন্যান্য বিভাগের লোকজন বিজ্ঞানীদের কথার অনুসরণ করবে। বিজ্ঞান নিয়ে অযথা টানা-হ্যাঁচড়া করার অধিকার কলাবিভাগের কারও নেই। এটা অবশ্যই বাস্তবসম্মত দাবি।

তাই আমি বিনয়ের সাথে বলছি, মাসজিদ একেবারে বন্ধ হবে কি না, জামাআতে সালাত কিংবা জুমুআ পড়তে লোকজন মাসজিদে যাবে কি না, কিংবা এই মহামারিতে বাসায় সালাত আদায় বৈধ কি না এসব ফিকহি বিষয়ে গাইরে আলিমরা নীরবতা অবলম্বন করলে ভালো হয়। আপনারা পার্সোনালি যে যেটার ওপর আমল করছেন, তা করতে থাকুন। কিন্তু পাবলিকলি সেটা প্রচার না করলেই ভালো হবে হয়তো। কেননা, আমরা আপনাদের ফলো করি ফেইসবুকে। আপনাদের লেখনীগুলো নিয়মিত পড়ি। তাই
আপনাদের অবস্থান যদি শারীআর দৃষ্টিতে সঠিক না হয়, তবে যে আমরা ভুল মেসেজ পাব।

সবচেয়ে বড়ো কথা হলো, এগুলো ফিকহের জটিল বিষয়। তাই কোন সময়ে শারীআর বিধান কী, তা নিয়ে আলিমরা কথাবার্তা বললেই বোধ হয় ভালো হবে। কেউ যদি বলতেই চান, তবে এটুকু বললে হয়তো ভালো হবে যে---"আমি অমুক আলিমের মতের ওপর আমল করছি।"

ব্যস, আপনার দায় কমে গেল। এর বাইরে গিয়ে কুরআন-হাদীস ঘেটে কোনো মাসাআলা বের করতে যাবেন না দয়া করে। এটা ইলমি বিষয়। তাই বিজ্ঞ আলিমদের ওপর এসব ন্যাস্ত করুন। আপনারা অন্যদিকে মনোযোগ দিন।

* এই যেমন ফান্ড কালেকশন। সামনের দিনগুলোতে হতদরিদ্র মানুষের কষ্টটা সবচেয়ে বেশি হবে। পুরো দেশ লকডাউন হয়ে গেলে, যারা দিন আনে দিন খায় তারা বিপদে পড়ে যাবে। তাই এই ব্যাপারটা নিয়ে এখনই প্ল্যান-পরিকল্পনা করা উচিত।

* করোনা আক্রান্ত মুসলিম মারা গেলে তার যেন দাফন-কাফন হয়, সে ব্যাপারে মানুষকে সজাগ করতে হবে। কেননা এটা ফরজে কিফায়া। সমাজের কেউই এগিয়ে না এলে সবাই গোনাহগার হবে।

* যে ডাক্তার পিপিই পায়নি, যে নার্স এখনও তা জোগাড় করতে পারেনি, তাদের পিপিই দিয়ে কীভাবে সাহায্য করা যায়, সেটার জন্যে জনসচেতনতা তৈরি করুন। কেননা, তারাই তো হাসপাতাল সামাল দিচ্ছে। অসুস্থদের সেবা করছে। তাই তাদের সেবা করাটা আমাদের দায়িত্ব। তারা যদি পিপিইর অভাবে সেবা দেওয়া বন্ধ রাখে, তা হলে রোগীদের দেখভাল করবে কে!

* পাশাপাশি মানুষের মধ্যে করোনা নিয়ে ব্যাপক গণসচেতনতা সৃষ্টি করা দরকার। করোনা থেকে বাঁচার জন্য কী কী সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে, কীভাবে কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে, করোনা ধরা পড়লে কী কী করতে হবে--- সেটা নিয়ে অব্যাহতভাবে লেখালেখি চালিয়ে যাওয়াটাও জরুরি। মানুষ যেন আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে যথাসাধ্য প্রস্তুতি নিতে পারে, সে ব্যাপারে সবাইকে সজাগ করতে হবে।

* পারলে আলিম-উলামাদের সামনে করোনার ভয়াবহতার চিত্র তুলে ধরুন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-সহ অন্যান্যদের দেওয়া রিপোর্টগুলো তাদের সামনে পেশ করুন। যেন তারা মাসজিদ-জামাআত নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছোতে পারেন। এখনও হাতে সময় আছে। আপনারা এগিয়ে আসুন। ইনশাআল্লাহ, আল্লাহ তাআলা সাহায্য করবেন।


২. বাংলাদেশের আলিমদের কাছে বিনীত আবেদন,

আপনারা আমাদের মাথার তাজ। যে কোনো ফাতাওয়ার জন্যে আমরা আপনাদের দিকেই তাকিয়ে থাকি৷ এখনও আপনারা আমাদের বিশ্বস্ত অভিভাবক। তাই এই মুহূর্তে আমাদের করণীয় কী, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিলে আমরা উপকৃত হব।

ইতোমধ্যে অনেকেই পার্সোনালি বিষয়টা নিয়ে আলোকপাত করেছেন। দলিল দিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করে মতামত তুলে ধরেছেন ফেইসবুকে। আলহামদুলিল্লাহ।
তবে আমজনতা আপনাদের অফিশিয়াল বক্তব্য জানতে চায়। অন্যান্য দেশ, যেমন : মধ্যপ্রাচ্য, মিশর, পাকিস্তান ইত্যাদি দেশের মতো আপনারা অফিশিয়াল ফতোয়া জারি করুন। যেমনটা আরবের উলামা-পরিষদ কিংবা পাকিস্তানের প্রখ্যাত মুফতি তাকী উসমানি (হাফিজাহুল্লাহ) করেছেন। ভিডিয়ো বার্তায় বিষয়টা ক্লিয়ার করেছেন অনেকেই। হাফিজাহুমুল্লাহ।

* এই মুহূর্তে এই দেশের মানুষদের ওপর করণীয় কী, সেটা জানিয়ে আপনারাও অফিশিয়াল ভিডিও বার্তা দিন, লিখিত ফাতাওয়া জারি করুন। যেন আমরা প্রশান্ত-চিত্তে আপনাদের ফাতাওয়া মেনে, নিজেদের ভাঙাচোরা আমলগুলো চালিয়ে যেতে পারি।

* প্রয়োজনে দ্বীনদার বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের পাশে রাখতে পারেন। আলহামদুলিল্লাহ, এখন তো ডাক্তার আলিমও আছেন অনেক। তবে কাজটা একটু দ্রুত হলে ভালো হয়। এমনিতেই জল অনেকদূর গড়িয়ে গেছে।
.
৩) আমার মতো সাধারণ মানুষ যারা, তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

আমি আপনাদের দলে। আপনাদের সহযাত্রী হিসেবে হাত জোর করে বলছি,

* মাসআলা-মাসায়েল জানার জন্যে কোনো নন-আলিম ফেইসবুক সেলিব্রেটির শরণাপন্ন হবেন না। এটা মারাত্মক পর্যায়ের অপরাধ। মাসআলা-মাসায়েল আলিমদের কাছে জিজ্ঞেস করে জেনে নেবেন। আল্লাহর দয়ায় এখনও অনেক আলিম ফেইসবুকে একটিভ আছেন। আর যদি অনলাইনে আলিম খুঁজে না পান, তবে অফলাইনে যোগাযোগ করার যথাসাধ্য চেষ্টা করবেন।

* আলিম না হয়ে ফিকহী বিষয়ে তর্কবিতর্ক করাটা, চরম মাত্রার মূর্খতা। এটা করলে তো কলাবিজ্ঞানীদের চেয়েও একধাপ এগিয়ে গেলেন আপনি। তাই এই নাজুক সময়ে মাসআলা-মাসায়েল নিয়ে অযথা বিতর্ক না করে, বেশি বেশি তাওবা-ইসতেগফার করুন। কাজে দেবে। শারীআর বিষয়গুলো পরিপূর্ণভাবে আলিমদের ওপর ন্যাস্ত করুন। এসবের চিন্তা ঝেড়ে ফেলে, নিজের ইবাদাতে পূর্ণ মনোযোগ দিন। আল্লাহকে ডাকুন। বিপদ থেকে পানাহ চান।

* সর্বাত্মক চেষ্টা করুন হতদরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্যে। একে অপরকে সচেতন করুন। হ্যান্ড সেনিটাইজার, মাস্ক, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য---এগুলো নিয়ে যথাসাধ্য দুস্থদের পাশে দাঁড়ান। ফকিরকে কিছু টাকা বাড়িয়ে দিন। রিক্সাওয়ালাকে ভাড়ার চেয়েও দশ-বিশ টাকা বাড়তি দেওয়ার চেষ্টা করুন।

* নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এত বেশি কিনবেন না, যাতে অন্যজনের অসুবিধা হয়৷ নয়তো কিয়ামাতের দিন আপনি দায়ী থাকবেন। আমরা যদি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য বেশি বেশি কিনে ঘরে মজুদ করে রাখি, তবে এতে অন্যদের ভোগান্তিতে পড়তে হবে৷ তাই যতটুকু দরকার, ঠিক ততটুকুই কিনুন।

* কোনো আড়তদার, মজুতদার, দোকানদার, ফার্মেসির মালিক যদি দ্রব্যের দাম বাড়ায়, তবে সামাজিকভাবে ওকে বয়কট করুন। ওর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন।

* কোনো পরিবার যদি কুয়ারেন্টাইনে থাকে, তবে তাদের জীবযাত্রা যেন ব্যহত না হয়, সেই খেয়াল রাখুন। তাদের বয়কট নয়, বরং নির্দিষ্ট দূরত্বে থেকে যথাসম্ভব সাহায্য করুন। করোনায় কোনো মুসলিম মারা গেলে যেন জানাযাবিহীন অবস্থায় দাফন না হতে হয়, সে খেয়াল রাখুন।

* কাজের অনেক কিছু বাকি আছে। আমরা যদি ফিকহ নিয়ে তর্কবিতর্ক করে সময় নষ্ট করি, তবে কোনো লাভই হবে না। এগিয়ে আসতে হবে সকলকে, নয়তো বিপদ অনেক ভয়ানক রূপ ধারণ করবে। সরকার একা কিছুই করতে পারবে না।

* এখনও সময় আছে, সাবধান হই। বন্ধুদের নিয়ে, পরিচিতজনদের নিয়ে সতর্কতার সাথে পরিকল্পনা করি। আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতে আল্লাহ তাআলা বারাকাহ দেবেন ইন শা আল্লাহ।  (লেখক: জাকারিয়া মাসুদ, সম্পাদক সত্যকথন)

ব্রেকিংনিউজ/এসপি

bnbd-ads