মনকে স্বাধীন করার কাজটাই রয়ে গেল বাকি

জাকির তালুকদার
৮ মার্চ ২০২০, রবিবার
প্রকাশিত: ০৯:৫৮ আপডেট: ১০:৩৩

মনকে স্বাধীন করার কাজটাই রয়ে গেল বাকি

আমাদের মননে ইউরোপ, প্রধানত ব্রিটেন এবং আমেরিকা, এখনও নিরঙ্কুশ প্রাধান্য বিস্তার করে রেখেছে। আমাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা এসেছে বটে, কিন্তু মনোজগতের উপনিবেশিক শাসন থেকে এখনও আমরা মুক্ত হতে পারিনি। আমাদের উপন্যাস, গল্প, প্রবন্ধ, কবিতা, অভিসন্দর্ভ, সকল রচনায় ঔপনিবেশিক প্রভুর অনুসরণ। এই তথ্য এডওয়ার্ড সাইদ পরিবেশন করার আগেই অনেক বাঙালি বুদ্ধিজীবীর চিন্তাতে এসেছিল। নিজস্ব পথ নির্মাণের তাগিদ অনুভব করেছিলেন অনেকেই। পরের অণুকরণ ও পরের আরোপিত চিন্তাধারা দিয়ে যে নিজেদের জন্য আলাদা ও পূর্ণাঙ্গ ভাষ্য নির্মাণ আদৌ সম্ভব নয় সে ব্যাপারে যেমন সিরিয়াস লেখালেখি তেমনই নেহায়েৎ বৈঠকি ভঙ্গিতে বারংবার আলোচনা করেছেন বিনয় সরকার। আমাদের মনোজগতে চল্লিশের দশকে অন্তত সাত-সাতটি বিদেশি প্রভাব কার্যকর ছিল। তাঁর মতে, ঊনবিংশ শতকের শিক্ষিত বাঙালির বাচ্চারা বিদেশি মাল খেয়ে মানুষ হয়েছে। বিংশ শতাব্দিতেও অপ্রতিহত সেই বিদেশি মাল। দেড়-দুইশ বছর ধরে বাঙালির প্রধান খাদ্য ছিল বিলাতি মনন-চিন্তন। ঊনবিংশ শতকের তথাকথিত আধুনিক সংস্কৃতির শুরুই হয়েছে বিলাতের ভাষা, সাহিত্য, জ্ঞানবিজ্ঞান, রাষ্ট্রিক ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক চিন্তাধারার ওপর ভর করে। ঐ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ফরাসি বিপ্লব ও ফরাসি সাহিত্য-সংস্কৃতি কিছুদিন ঢেউ তুলেছিল বাঙালি মধ্যবিত্ত শিক্ষিত সমাজে। ফরাসি কঁৎ-দর্শন ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিল সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমের উপর। অনেকেরই ধারণা, বঙ্কিমের হিন্দু ধর্মদর্শন পুরোটাই কঁৎ-প্রভাবিত। ১৮৭০-৮৫ সাল পর্যন্ত মার্কিন বিপ্লব ও সংস্কৃতি নিয়েও কিছুটা ঢেউ উঠেছিল। সেইসময় হেমচন্দ্র মার্কিন-প্রশস্তি লিখেছেন- ‘হোথা আমেরিকা নব-অভ্যুদয়/ পৃথিবী গ্রাসিতে আসিছে আশয়’। একেবারে যথার্থ ভবিষ্যৎ অনুধাবন। নিজের বাণী বিশ্বমাঝে পৌঁছে দেবার জন্য আমেরিকাকেই বেছে নিয়েছিলেন বিবেকানন্দ। ইতালিয়ান আর জার্মান প্রভাব বাংলায় আসে একসঙ্গে। ১৮৬০-৭০ সালের মধ্যে ইতালির স্বাধীনতা অর্জন এবং জার্মান-সাম্রাজ্যেরও প্রতিষ্ঠা।

এই দুই ঘটনা বাঙালিকে কিছুটা চাঙ্গা করে তুলেছিল। ইতালিয়ান মাৎসিনি আর জার্মান বিসমার্কের নাম না নিলে কোনো বাঙালি কংগ্রেসীর তিন বেলার ভাত হজম হতো না। মাৎসিনি ও গ্যারিবল্ডির জীবনী সকল শিক্ষিত বাঙালি তরুণের অবশ্যপাঠ্য ছিল। যোগীন বিদ্যাভূষণ ছিলেন এই আন্দোলনের চাঁই। সুরেন বন্দ্যোপাধ্যায়, ব্রজেন শীল, বিপিন পাল প্রমুখ দেশনায়করা সারা দেশে মাৎসিনি সম্পর্কে বক্তৃতা দিয়ে বেরিয়েছেন। আর বিনয় সরকারের সরাসরি অভিমত হচ্ছে- ব্রজেন শীল, সতীশ মুখোপাধ্যায়, শিবনাথ শাস্ত্রী, হীরালাল হালদার ইত্যাদি প-িতরা বিবেকানন্দ’র যুগে জার্মান হেগেল খেয়ে মানুষ হয়েছে। ভারতবর্ষীয় ঐক্যের প্রবক্তারা কথায় কথায় বিসমার্ক প্রবর্তিত জার্মান ঐক্যের উদাহরণ দিতেন। ন্যাশনাল কলেজ প্রতিষ্ঠার সময় উদ্যোক্তাদের সামনে ছিল জার্মান আদর্শ। রাসবিহারী ঘোষ ছিলেন জার্মান অর্থনীতিবিদ ফ্রিডারিখ লিখ্ট-এর দারুণ ভক্ত।

সবশেষে এলো রুশ প্রভাব। মানবেন্দ্রনাথ রায়,ভূপেন দত্ত, বীরেন চট্টোপাধ্যায়, অবনী মুখোপাধ্যায় প্রমুখ ‘মস্কো থেকে হজ’ করে এসে ঝাঁপিয়ে পড়লেন বলশেভিক বিপ্লবের বাণী প্রচারে। রুশপ্রভাব অন্যভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে। তবে প্রথম থেকে অদ্যাবধি বাঙালি বিশ্ব দেখতে অভ্যস্ত ইংরেজির চোখেই। বিনয় সরকার আক্ষেপ করে বললেন- ‘এই জন্য আজ পর্যন্ত বঙ্গসন্তানের চোখ ফুটল না। আমাদের অধ্যাপক, বিজ্ঞান-গবেষক, সাংবাদিক, লেখক, শিল্পী, বণিক, মজুর-নায়ক ইত্যাদি নানা পেশার লোকেরা অত্যাধিক ইংরেজ-চোখো লোক। আমাদের সংস্কৃতি বিলাতি সংস্কৃতির মফস্বলে পরিণত হয়েছে। বিলাতি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাধিধারী অধ্যাপকগুলো যুবক-বাঙালিকে ইংরেজের সত্যিকারের গোলামে পরিণত করে ছেড়েছে।’

এই পরিস্থিতি এখনও অটুট। বলা যায় আশঙ্কাজনক হারে বর্ধিষ্ণু। ব্রিটিশের বদলে প্রধান জায়গা নিয়েছে কেবল আমেরিকা। ঔপনিবেশিকতা আরো বেশি প্রকট। আমাদের সাহিত্যের জগতে এই প্রবণতা একবারে মহামারির আকার ধারণ করে আছে। ছেদ টেনে দিয়েছে আমাদের আবহমান বাংলার সাহিত্যিক উত্তরাধিকারের সঙ্গে আমাদের উত্তরপুরুষদের। আমরা নিজেরা সেই হারানো সূত্রের সন্ধান না করে সাহিত্যে চালিয়ে যাচ্ছি ঔপনিবেশিক আকরণ ও অবয়ব। ফলে আমাদের রচনা বাংলায় লেখা হলে তা ‘বাংলার’ কি না এই সন্দেহ সবসময় থেকেই যাচ্ছে- কখনো প্রচ্ছন্নভাবে কখনো প্রকটভাবে। এই ব্যাপারে তো সন্দেহের কোনো অবকাশই নেই যে জনসমাজের আখ্যানপাঠের আকাক্সক্ষা লোকায়ত ঐতিহ্যবাহিত প্রকরণগুলির মধ্য দিয়েই পূরণ হওয়া সম্ভব। মনে রাখতে হবে লোকায়ত অভিব্যক্তিগুলি শুধু লেখ্য নয়, কথ্যরূপেও বিরাজমান ছিল। তাই আমাদের ঐতিহ্যবাহিত লেখ্য-প্রকরণগুলিও পাঠ এবং শ্রুতির বিষয়টি মনে রাখত সবসময়। কথক বা কথনীয়া-পাঠকরা ছিলেন আমাদের সাহিত্য প্রবাহের অন্যতম প্রধান বাহন। প্রাক-ঔপনিবেশিক বাঙালি সমাজে আমরা ধারাবাহিকভাবে প্রবহমান এমন এক সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়ার সন্ধান পাই যাতে সামাজিক অভিজ্ঞতালব্ধ আখ্যানবয়নের কিছু কিছু পরীক্ষিত পদ্ধতি ছিল স্বীকৃত। এই পদ্ধতিগুলি সাধারণভাবে পারস্পরিক সহযোগমূলক অর্থাৎ আখ্যানপ্রণেতা এবং তার শ্রোতা-পাঠকের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ অব্যাহত রাখা সম্ভব ছিল।

উপনিবেশবাদের পত্তনে শুধু আমাদের মসলিন শিল্পই নয়, ভেঙে গেল আমাদের ঐ সাহিত্যিক ধারাবাহিকতারও উপলব্ধি। অস্বীকৃত হলো লেখক ও পাঠকের দ্বিবাচনিকতার আকরণ। বাংলা উপন্যাসের তথা কথাসাহিত্যের জন্মের প্রেক্ষিত এটাই। এল ইউরোপীয় কাঠামো। পাশ্চাত্যের সাথে প্রতিতুলনা না করতে পারলে কাউকে যেন কোনো ধরনের স্বীকৃতিপ্রদান ছিল এককথায় অসম্ভব। যে ইংরেজের সাথে প্রতিতুলনা করা হতো, যাকে মান বা স্ট্যান্ডার্ড ধরা হতো তার মান অনেক সময়ই উপমিত-র তুলনায় কমই ছিল। যেমন বঙ্কিমচন্দ্রকে আখ্যা দেওয়া হতো ‘বাংলার ওয়াল্টার স্কট’ নামে। অথচ অসুস্থ স্বাদেশিকতার কথাটা বাদ দিলে অন্য সব ক্ষেত্রেই বঙ্কিমের প্রতিভা ও কৃতি ওয়াল্টার স্কটের তুলনায় অনেক বেশি। যদিও আবহমান বাংলার সাহিত্য-প্রাকরণিক ঐতিহ্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বঙ্কিমচন্দ্রের হাতেই, কিন্তু তাঁর লিখনশৈলীর  শক্তিমত্তাকে অস্বীকারের কোনো সুযোগ বঙ্কিম তাঁর সবচেয়ে বড় নিন্দুকের জন্যও রাখেননি। তবে ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গেছে। সেই ক্ষতির বিবরণ সংক্ষেপে সার আকারে তুলে ধরেছেন দেবেশ রায়- ‘বাংলা উপন্যাসে সঞ্চারিত হয়নি লোকায়তের পৌরুষ, বাংলা উপন্যাসের কাহিনীতে আসেনি পুরাণ বা মিথ, ভাষার লোকায়তিক পেশি, বাংলা উপন্যাসের সংলাপে আসেনি আমাদের প্রতি ক্রোশে আলাদা উপভাষার খর চলিষ্ণুতা ও ব্যঙ্গশ্লেষ রসিকতার শান! এই নদী, এই বৃষ্টি, এই বাতাস, এই পাহাড়, এই সমতল আর এই সমুদ্রকে অন্বিত করে যে-মানুষ সে তার নিজের বাঁচার কাহিনী নিয়ে আমাদের উপন্যাসে এল না। আমরা উপন্যাসে কাহিনী খুঁজেছিলাম, কাহিনীর সেই মায়ামৃগ আত্মপরিচয় থেকে আমাদের আরো দূরে সরিয়ে এনেছে।’

এই পর্যন্ত কোনো দ্বিমতের অবকাশ নেই। কারণ আমরা যারা এখন ‘বাংলাদেশের বাংলা গল্প’ লিখব বলে নিজেদের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, তাদের হারিয়ে যাওয়া আবহমান পথ ফের খুঁজে নেওয়া ও ধসে যাওয়া আবহমান সাঁকোর পুননির্মাণের কোনো বিকল্প নেই। সমস্যা তৈরি হয় যখন শিকড় খোঁজার নামে ধর্মীয় মৌলবাদ ঢুকে পড়ে আমাদের সাহিত্যের নিটোল সবুজ করুণ জমিনে।

০২.
সমস্যার সূত্রপাত ঘটানো হয় সুকৌশলে ছদ্ম মৌলবাদী বুদ্ধিজীবীদের দ্বারা। বিশ্বব্যাংক-এর নাগপাশ, পশ্চিমা বহুজাতিক কোম্পানিগুলির সর্বব্যাপী শোষণ, আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ দখল নিতে বিশ্বজুড়ে সাম্রাজ্যবাদীদের কাড়াকাড়ি, মুসলিম বিশ্বের ওপর মার্কিনী-নেতৃত্বে পশ্চিমা দেশগুলির প্রত্যক্ষ আগ্রাসন, বিশ্বজুড়ে মার্কিনীদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের লজ্জাহীন দৃষ্টান্তস্থাপন- সব মিলিয়ে পশ্চিমা-বিরোধী একটি হাওয়া আমাদের দেশে প্রবহমান, এবং ক্রমাগত শক্তি সঞ্চয়ের পথে। এই পথেই ঢোকার অপচেষ্টা মৌলবাদীদের। গরীব-মেহনতী মানুষের শোষণমুক্তির অন্যতম আদর্শ মার্কসবাদকে ‘ইউরো-মতবাদের’ ছাপ মেরে মানুষের মন বিষিয়ে তোলার চেষ্টায় তারা অত্যন্ত তৎপর। মার্কসবাদের এমন সব যান্ত্রিক ব্যাখ্যা তারা উত্থাপন করছে মানুষের সামনে, যাতে সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা প্রগতিশীল লেখকরা পর্যন্ত অনেক সময় দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। এই বিভ্রান্তির ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটছে তরুণ লেখক ও সংস্কৃতিকর্মীদের মধ্যে।

মার্কসবাদকে প্রয়োজনে পরিত্যাগ করতে আমাদের আপত্তি থাকার কথা নয়। যদি তা আমাদের চিন্তার মুক্তি ও শোষণমুক্তির আন্দোলনে সহায়ক না হয়ে প্রতিকূলতা নিয়ে আসে, তবে অবশ্যই তা বিষবৎ পরিত্যাজ্য। তবে তার জন্য যে ব্যাপক পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণের পাশাপাশি বিতর্কেরও প্রয়োজন, সেই সুযোগটুকু মার্কসবাদকে দেওয়া হোক- এটাই সময়ের দাবি। শত বছর ব্যাপী মানবমুক্তির সংগ্রামে বিপ্লবীদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার মার্কসবাদ ও মার্কসবাদী নন্দনতত্ত্ব এটুকু দাবি তো করতেই পারে। আর বাংলাদেশে যতটুকু প্রগতিশীল সৃজনশীলতা দেখা গেছে, তার সবটুকুই মার্কসবাদীদের দ্বারা অনুপ্রাণিত।   

মার্কসবাদকে আমরা, আমি নিজেও, চিনেছি অর্থনীতির অসমতা দিয়েই। কিন্তু মনোজগতের উপনিবেশ থেকে মুক্তি পাওয়ার যে পথ মার্কসবাদে রয়েছে, যা দিয়ে নিজেদের মুক্তিপ্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন রাহুল সাংকৃত্যায়ন, ফ্রানজ ফ্যানো প্রমুখ, সেই কাজটিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াটি শুরু করাটাই তো হলো না আমাদের। আমার।
বাকির খাতায় আর কতদিন ফেলে রাখব তাকে?   

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক      [লিখা: সংগৃহিত]             

ব্রেকিংনিউজ/এমআর

bnbd-ads