২১ মানে মাথা নত নয় অধিকার আদায়ের দৃঢ় প্রত্যয়

মো. মিজানুর রহমান
২০ ফেব্রুয়ারি ২০২০, বৃহস্পতিবার
প্রকাশিত: ০৪:৫১ আপডেট: ০৪:৫৮

২১ মানে মাথা নত নয় অধিকার আদায়ের দৃঢ় প্রত্যয়

১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর ১২০০ মাইলের বেশি ব্যবধান দূরে পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তান নিয়ে গঠিত হয় পাকিস্তান নামক এক রাষ্ট্র। শুরু থেকেই পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তানে লাঞ্ছনা-বঞ্চনা, শাসন-শোষণ করে আসতেছিলেন। অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিকসহ সকল ক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তানীদের দ্বারা পূর্ব পাকিস্তান বৈষম্যের শিকার হন। দেখা যায়-৫৬.৪% মানুষের মুখের ভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও মাত্র ৩.২৭% মানুষের মুখের ভাষা উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার জন্য এবং পূর্ব পাকিস্তানের জনগণদের উর্দু ভাষায় কথা বলার জন্য শাসকগোষ্ঠী চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন। এক পর্যায়ে ১৯৫২ সালের ৩০ জানুয়ারী পাকিস্তানী প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন পল্টনে এক জনসভায়, “উর্দুই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে’’ ঘোষণা দেন। জনসভাস্থলেই প্রতিবাদী ছাত্রসমাজ ও জনতা-না, না, না বলে প্রতিবাদ করেন।

পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ বাংলাভাষায় কথা বলার অধিকারে ছিলেন দৃঢ় প্রত্যয়। তাই ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি বাংলাভাষায় কথা বলার অধিকারকামী দৃঢ় প্রত্যয়ী জনগণ পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে স্লোগানসহ মিছিল বের করেন। সেই মিছিলের উপর নির্বিচারে গুলি চালায় পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী। ফলে ভাষার জন্য শহীদ হন সালাম, বরকত, জব্বার, রফিক, শফিক, কিশোর ওহিউল্লাহসহ নাম না জানা আরো অনেকে। সেদিন তারা বাংলাভাষায় কথা বলার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বুকের তাজা রক্ত রাজপথে ঢ়েলে দেন-তারই ফলশ্রুতিতে ১৯৫৬ সালের পাকিস্তানের শাসনতন্ত্রে বাংলাভাষা তার মর্যাদা পায়। 

অধিকার আদায়ে সফল এ দৃঢ় প্রত্যয়ের উপর ভিত্তি করেই ১৯৭১ সালে আসে আমাদের দেশের স্বাধীনতা অর্থাৎ ১৯৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তানিদের সাথে শেখ মুজিবুর রহমান এর ক্ষমতার দেন-দরবারের সুরাহা না হওয়ায় পাকিস্তানিরা যখন তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় এবং নির্বিচারে পূর্ব পাকিস্তানীদের গুলি করে হত্যাযজ্ঞ চালায়, তখন চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং সে ঘোষণা শুনে দেশের কৃষক-শৃমিক-আবাল-বৃদ্ধ-বণিতাসহ জনগণ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে ৯ মাস যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেন। দেশ স্বাধীনের পর তৎকালীন শাসকের অদক্ষতায় দেশ দুর্ভিক্ষ ও দুর্নীতির রাহুগ্রাসে পতিত হয় এবং সৃষ্ট পরিস্থিতিতে শেখ মুজিবুর রহমান পরিবার-পরিজনসহ নিহত হন (শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ব্যতীত)। দেশে আবার সংকট দেখা দেয়। কিন্তু অধিকারকামী এ জনগণ অর্থাৎ সিপাহী-জনতা ঐক্যবদ্ধ হয়ে সেই সংকটে তাদের নেতৃত্ব ঠিকই বেছে নেন-তারা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করেন স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমানকে। দেশের জনগণ যেনো আবার মুক্তি পায়।

অতঃপর আশির দশকের শুরুতেই জেনারেল এরশাদ এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচারী কায়দায় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। আর সেই স্বৈরশাসককে ক্ষমতায় থাকতে পাতানো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে সহায়তা করে আওয়ামীলীগ কিন্তু কোন আপোস না করে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে দেশের মানুষের অধিকার আদায়ে যুগৎপৎ আন্দোলন করেন বেগম খালেদা জিয়া ও তার নেতৃত্বাধীন বিএনপি। দীর্ঘ টানা ৯ বছর এ দেশের জনগণের আধিকার প্রতিষ্ঠায় আন্দোলন করে সফল হন বেগম খালেদা জিয়া এবং ৯০ এর গণ অভ্যুত্থানের পর অবাধ, সৃষ্ট, নিরপেক্ষ অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পর ক্ষমতায় আসেন মানুষের আধিকার আদায়ে দৃঢ় প্রত্যয়ী দল বিএনপি আর দেশের ইতিহাসে প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হন বেগম খালেদা জিয়া।

যুগপৎ আন্দোলনের মাধ্যমে আধিকার আদায়ের দৃঢ় প্রত্যয়ী এ দেশের জনগণ একবিংশ শতাব্দীর এই লগ্নে আবার অধিকার হারা, লাঞ্ছনা-বঞ্চনা আর শাসন-শোষণে বন্দি। মানুষ তাদের অধিকার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন না। ভোটকেন্দ্রগুলো দখল করে রাখেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী ক্যাডাররা-সন্ত্রাসীরা আর তাদের সহায়তা প্রদান করেন আইনের রক্ষক হয়ে ভক্ষকধারী এক শ্রেণীর আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী। ফলে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে ভোট গ্রহণ, বিরোধী দল বিএনপি’র উপর আইন-নিয়ম বর্হিভূতভাবে দমন-পীড়ন, অত্যাচার-নির্যাতন, মামলা-গ্রেফতার, রিমান্ড, গুম, অপহরণ ইত্যাদির খড়গ নেমে আসে। আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর কাছে গিয়েও কোন প্রত্যাশিত ফলাফল হয় না বরং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী উল্টো বিএনপিদের গ্রেফতার করেন, মামলা দেন।

বছরে বছরে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করে যাচ্ছেন বর্তমান সরকার। নিত্যপণ্যের দাম ক্রমাগত বৃদ্ধি-সম্প্রতি পেঁয়াজের দাম (বিএনপি সরকারের ২০০৬ সালের তুলনায় এই শাসকের সময় ২০১৯ সাল) বৃদ্ধি পায় প্রায় ৪৩০%, পথে-ঘাটে, মার্কেটে, বাসাবাড়িতে কোথাও যেনো মানুষ নিজেকে নিরাপদবোধ করেন না। মুক্তমনে আধিকার সম্বলিত হক কথাও বলতে পারেন না। মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে জবর-দখল ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ক্ষমতাসীনদের অনিয়ম, অবিচার, শোষণ, চুরি, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, দমননীতি আর মানুষের প্রতি জবরদস্তি, ভয়-ভীতি এতই বেড়ে গিয়েছে যে,ক্ষমতাসীনদের বিষয়ে কাউকে কোন টু শব্দ করতে দিচ্ছেন না আর এ কাজে সহযোগিতা করতেছেন ভোটের সময় নির্বাচন কমিশনের মতো লোকজন এবং বছরজুড়ে আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী।

নিরাপত্তাহীন, অধিকারহারা মানুষের হয়ে যিনি ও যার দল কথা বলেন ভোটারবিহীন ক্ষমতাসীনরা ও তাদের আনুগত্যকারী দোসররা তাঁকে (বেগম খালেদা জিয়াকে) সাজানো মামলায় সাজা দিয়ে কারাবন্দি করে রেখেছেন, অধিকার সম্বলিত জামিন না দিয়ে, সুচিকিৎসা না দিয়ে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছেন এবং তাঁর দলের দেশব্যাপী লক্ষ লক্ষ নেতাকর্মীদের নামে লক্ষ লক্ষ মামলা দিচ্ছেন- মামলার ধরন এমন যে, আপরাধ করতেছেন ক্ষমতাসীনরা আর মামলা হচ্ছে বিরোধী দল বিএনপিদের নামে-এর ধারাবাহিক উদাহরণ সমূহের মধ্যে অনুষ্ঠিত সিটি করপোরেশন নির্বাচনের দিকে তাকালেই বুঝা যায়। মানুষের আধিকার আদায়ের দৃঢ় প্রত্যয়ী নেত্রী গণতন্ত্রের মা বেগম খালেদা জিয়ার জামিন নিয়ে ক্ষমতাসীনদের তাল-বাহানা আর শর্ত দেখে দেশের জনগণ আজ বিস্মিত। সাধারণ জনগণ চায় তাঁর সুচিকিৎসার প্রয়োজন আর জামিন তাঁর হক; অতএব, জামিন দেওয়া হোক। সাধারণ জনগণের মনে আজ এ ধারণা গেঁথে গেছে যে, তিনি নিজের জন্য না, দেশের মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য আজ জবর-দখল ক্ষমতাসীন এর দ্বারা প্রতিহিংসা ও জিঘাংসার শিকার হয়ে বন্দি হয়ে আছেন এবং সুচিকিৎসা না পেয়ে জীবন-মরণের সন্ধিক্ষণে আছেন। কেননা, তাঁকে প্রয়োজন-অনুসারে সুচিকিৎসা দেয়া হচ্ছে না। 

এমতাবস্থায় দেশের জনগণের অধিকার ফিরে দেয়ার জন্যই হাজারো বাঁধা আর ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও বিএনপি-কে সঠিকভাবে দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। ইতিহাস স্বাক্ষী এ দেশের জনগণের অধিকার দাবায়ে রাখা যায় না। ১৯৫২ ও ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী পারেননি। ৯০ দশকে স্বৈরশাসক এরশাদ পারেননি। আর জনগণ প্রত্যাশী এ বারও জবর-দখলকারী জেঁকে বসা এ শাসক ও তাদের সহায়তাকারী দোসররা তাদেরকে আধিকার বঞ্চিত করে রাখতে পারবে না। আধিকার আদায়ে আন্দোলনকারী নেতৃত্ব ও দল এর সাথে মিশে ঐক্যবদ্ধভাবে ঠিকই আধিকার আদায়ে দৃঢ় প্রত্যয়ী জনগণ তাদের আধিকার ফিরে আনবে-সেদিন হয়তো আর বেশি দূরে নয়- ‘যেখানে জবর-দখল ক্ষমতাধারীদের নিপাত করবে, জনগণ তাদের অধিকার ফিরে আনবে। রুখে দিবে ষড়যন্ত্র-ধ্বংস করবে স্বৈরতন্ত্র, মুক্ত করবে গণতন্ত্রের মাকে-আর মুক্ত হবে গণতন্ত্র।’

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

ব্রেকিংনিউজ/ এসএ 
 

(মতামত বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি’র সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত লেখকের মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। ফলে লেখকের মতামত নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না ব্রেকিংনিউজ)

bnbd-ads