বশেমুরবিপ্রবি‘র ৪১৩ শিক্ষার্থীর ‘স্বপ্নভঙ্গ’

দিপু কুমার
১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, সোমবার
প্রকাশিত: ০৭:৪৪ আপডেট: ০৮:০২

বশেমুরবিপ্রবি‘র ৪১৩ শিক্ষার্থীর ‘স্বপ্নভঙ্গ’

সম্প্রতি আন্দোলন সংগ্রামে উত্তাল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি (বশেমুরবিপ্র) বিশ্ববিদ্যালয়। ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থীরা রয়েছে এই আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্রে। ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে প্রথম এই বিভাগে ভর্তি হয় স্বপ্নবাজ এক ঝাঁক তরুণ। চোখে মুখে নব স্বপ্ন ও তারুণ্যে উজ্জীবিত এই শিক্ষার্থীদের জীবন ও স্বপ্ন এখন সংকটের মুখে। তাদের স্বপ্ন এখন মুখ থুবড়ে পড়ার পথে অগ্রসর হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বিভাগটি চালু করার পূর্বে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ইউজিসি থেকে কোন অনুমোদন নেয়নি। ফলে ইউজিসি থেকে বলা হচ্ছে, যে তিনটি ব্যাচ ইতিমধ্যে চালু হয়েছে এদের পরে আর কোন শিক্ষার্থীকে এই বিভাগে ভর্তি করা হবে না। বিভাগটিকে বন্ধ করে দেওয়ার একটি মৌখিক ঘোষণা দেওয়া হয়েছে ইউজিসি থেকে। এই ঘোষণার পরেই বিক্ষোভে ফেটে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। 

তাদের দাবি কলা অনুষদের অধীনে স্বতন্ত্র বিভাগ হিসেবে ইতিহাস বিভাগ চালু রাখতে হবে। 

এ দিকে ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করেন। পরবর্তীকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষার্থী এই আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করে ও আন্দোলনে একাত্মতা ঘোষণা করে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে অচলাবস্থা বিরাজ করছে, তালা ঝুলছে সকল প্রশাসনিক ভবনে।

গত ১০ফেব্রুয়ারি ২০২০ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে পর শিক্ষার্থীদের পাঁচ জনের একটি প্রতিনিধি দল আসেন। তারা সাক্ষাৎ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক, ইতিহাস চর্চা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি প্রফেসর ড. মেসবাহ কামাল-এর সঙ্গে। প্রতিনিধি দল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ও বাংলাদেশ ইতিহাস সমিতির সাধারণ সম্পাদক ড.আশা ইসলাম নাঈম এর শরণাপন্ন হন। 

১১ফেব্রুয়ারি ২০২০ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে ও গোপালগঞ্জ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে আগত শিক্ষার্থীদের পাঁচ জনের প্রতিনিধির সমন্বয়ে সংহতি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে। এই সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন জন-ইতিহাস চর্চা কেন্দ্রের সভাপতি প্রফেসর ড. মেসবাহ কামাল, বাংলাদেশ ইতিহাস সমিতিরি সাধালণ সম্পাদক প্রফেসর ড. আশা ইসলাম নাঈমসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. প্রদীপ চাঁন দুগার এবং ড.ঈশানী চক্রবর্তী।

সংহতি সমাবেশে অংশ নেওয়া প্রথিতযশা ঐতিহাসিক অধ্যাপক ড. মেসবাহ কামাল বলেন, ‘ইতিহাস মানবসভ্যতার ধারাবাহিকতা, প্রগতি এবং বিকাশকে ধারণ করে। তাই ইতিহাসের শিক্ষক মানবসভ্যতার শুধু পরিব্রাজকই নয়, মানবসভ্যতার ধারক ও বাহক। ইতিহাস অনুশীলনের মাধ্যমে, চর্চা করার মাধ্যমে একজন ইতিহাসবিদ ইতিহাস চেতনাকে ধারণ করেন।’

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ইতিহাস সমিতি,জন-ইতিহাস চর্চা কেন্দ্র, বাংলাদেশ ইতিহাস সম্মিলনী, ইতিহাস একাডেমিসহ ইতিহাসের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত সকল সংগঠন ঐক্যবদ্ধ হয়ে যা কিছু করা দরকার প্রয়োজনে তাই করবে। দরকার হলে শিক্ষামন্ত্রীর কাছে যাবো এমকি আরো প্রয়োজন হলে প্রধানমন্ত্রীর কাছে যাবারও ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।

সংহতি প্রকাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের এম.এ শিক্ষার্থী আবু বকর সিদ্দিক বলেন,‘ইতিহাস একটি সহনশীল, মানবিক এবং প্রগতিশীল রাষ্ট বিনির্মাণে অবদান রাখে। ইাতহাস বিভাগ ছাড়া একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্তিত্ব অসম্পূর্ণ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগ বন্ধ করে দেওয়া একটি অশুভ পরিকল্পনা। প্রশাসনিক ত্রুটির কারণে একটি বিভাগ বন্ধ করে দেওয়া যায় না।’

তিনি আরও বলেন, ‘সিদ্ধান্তটি এমন সময় নেওয়া হচ্ছে যখন জাতির পিতার জন্মশতবর্ষের ক্ষণ গণনা চলছে। জাতির এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এসে ইতিহাস বিভাগ বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিশ্চিতভাবে একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন অধ্যায়ের সূচনা করবে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকেরাও সংহতি প্রকাশ করে সমাবেশ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বিশ্ববিদ্যালয়টির শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে। ওই সমাবেশে বক্তব্য রাখেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. মুজাহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগ থাকবে না এটা ভাবা ঠিক নয়। জ্ঞান চর্চার জন্য ইতিহাস বিভাগ ও দর্শন চর্চার কোন বিকল্প নেই। জ্ঞান চর্চায় দর্শন হলো মা আর ইতিহাসকে বলা হয় বাবা। ইতিহাসকে খাটো করে দেখার কিছু নেই। বিজ্ঞানের মাধ্যমেই শুধু জ্ঞান চর্চা হয় না। জ্ঞান চর্চার জন্য দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ইতিহাস থাকা বাধ্যতামূলক করা উচিত। ইতিহাস বিভাগ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ণতা পায়না’।

জ্ঞানচর্চার যে বিভিন্ন শাখা রয়েছে তন্নধ্যে গুরুত্বপূর্ণ শাখা হলো ইতিহাস। পৃথিবীর খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রয়েছে ইতিহাস বিভাগ। অক্সফোর্ড, কেম্ব্রিজ, এমনকি ভারতের অন্যতম যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ও জওহরলাল বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে ইতিহাস বিভাগ। একটা জাতির মধ্যে দেশাত্মবোধের চেতনার বিকাশে গুরুত্ব রয়েছে ইতিহাস বিভাগের। দেশাত্মবোধের চেতনার মাধ্যমে ইতিহাস জাতীয়তাবোধ জাগ্রত করে জাতীয় রাষ্ট্র গঠনে ভূমিকা রাখে। এছাড়া একটা রাষ্ট্রের ইাতহাসের ভিত্তির ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে তার রাজনীতি এবং অর্থনীতি। ইতিহাসের জ্ঞান রাষ্টের জনগণের মধ্যে তৈরি করে ঐক্যতার মেলবন্ধন। ইতিহাসের এই বিভিন্নমুখি অবদানের ফলে এর গুরুত্বকে কোনভাবেই অস্বীকার করা যায়না। জাতি গঠনের অনবদ্য এক হাতিয়ারের নাম ইতিহাস।
 
জাতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগ বন্ধের ঘোষণাটি একটি অযৌক্তিক সিদ্ধান্তের নামান্তর। প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার ভুক্তভোগী কোনভাবেই শিক্ষার্থীরা হতে পারে না । সবচেয়ে বড় কথা বঙ্গবন্ধু যিনি নিজেই স্বয়ং ইতিহাসের নির্মাতা তার নামের বিশ্ববিদ্যালয়েই ইতিহাস বিভাগ বন্ধ হবে এটি কোনভাবেই কাম্য নয়। এই ধরনের ঘোষণা একটি উদ্বেগ ও শঙ্কা তৈরির পাশাপাশি একটি হতাশার বার্তাও বহন করে। ইউজিসি  কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি দ্রুততম সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রশাসনিক জটিলতা দূর করে ইতিহাস বিভাগকে স্বতন্ত্র্য বিভাগরূপে চালু করার।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগে তিনটি ব্যাচে মোট ভর্তি ৪১৩ জন শিক্ষার্থী। তাদের ও পরিবারের স্বপ্নপূরণ করতে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতিহাস বিভাগ চালু করা হোক। এর স্থায়িত্বকরণের মাধ্যমে মুজিববর্ষকে আলোকিতকরণের মহান দায়িত্ব শুরু হোক ইউজিসির হাত ধরেই।

লেখক: ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ব্রেকিংনিউজ/এমএইচ

bnbd-ads