বেসরকারি শিক্ষায় বৈষম্য কতকাল?

শাহ আলম সরকার
২৮ জানুয়ারি ২০২০, মঙ্গলবার
প্রকাশিত: ০২:৩৫ আপডেট: ০২:৩৬

বেসরকারি শিক্ষায় বৈষম্য কতকাল?

শিক্ষা খাতে বিরাজমান সরকারি-বেসরকারি বৈষম্য সত্ত্বেও শিক্ষাকে সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য বর্তমান সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ প্রশংসার দাবিদার। বর্তমান দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে দেশকে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। একটি সুশিক্ষিত জনগোষ্ঠীই পারে দেশকে অগ্রগতি উন্নয়নের দিকে নিয়ে যেতে। রাষ্ট্রের এ মহান গুরুদায়িত্ব কাজটি সম্পন্ন করতে যারা সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন তারা হলেন শিক্ষক।

বর্তমানে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা প্রধানত দু’ধরনের সরকারি ও বেসরকারি। এ দু’ধরনের শিক্ষায় বাংলাদেশে অর্জন অনেক। আমাদের শিক্ষার যথেষ্ট প্রসার ঘটেছে। প্রাথমিক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষায় যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে পাসের হার প্রায় শতভাগ। সরকারও বিনামূল্যে বই শিক্ষার্থীর হাতে তুলে দিয়ে একটি যুগান্তকারী ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। জাতীয় স্কেল প্রদান করা হয়েছে। সে স্কেলে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্মরত শিক্ষক ও কর্মচারীরা। তার পরও দেশের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কিছু বৈষম্য রয়েছে। 

আজ শিক্ষার মত মৌলিক বিষয় নিয়ে রাষ্ট্রে ব্যাপক অস্থিরতা লক্ষ্যণীয়। একই দেশে ভিন্ন ভিন্ন ধারায় শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালিত হচ্ছে। সরকারি, আধা সরকারি, বেসরকারি, প্রাইভেট এমনকি বিভিন্ন বিভাগের নিজস্ব তত্ত্বাবধানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও রয়েছে।
 
কি আজব দেশ! বঙ্গবন্ধু দেশ স্বাধীনতার পর পরই যুদ্ধাবস্থায় প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয়করণ গুরত্ব বুঝলেও এতোকাল পরে এসেও রাষ্ট্রের কর্তাদের সময় হয়নি মাধ্যমিক শিক্ষা জাতীয়করণ করা বা ভাবনার। বিলম্ব, অব্যবস্থাপনা আর বৈষম্যই যেন শিক্ষার প্রবাহ !

অন্যদিকে এমপিওভুক্ত প্রায় ২৮ হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সরকার জাতীয় বেতন স্কেলে অন্তর্ভুক্ত করে শিক্ষায় ব্যাপক অর্থ ব্যয় করছে। অথচ এ প্রক্রিয়ার সাথে সামান্য ভাতাদি যোগ করলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের আওতায় আনা যায় সহজেই। এতে শিক্ষায় বৈষম্য দূরীকরণ ও সার্বজনীন করা সম্ভব হয়। 

বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে দেশ এবং স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীও আসন্ন কিন্তু শিক্ষায় অস্থিরতাও প্রচণ্ড। সেই ২০০৫ সাল থেকেই  বলতে শুনেছি জাতীয়করণ আসন্ন। চলে গেল একযুগের বেশি। তবুও মেলেনি কপাল পুরা জাতির মৌলিকতার শিক্ষা সুবিধা।

উপশহর বা উপজেলা কেন্দ্রিক দুটি করে প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের আওতায় আসলেও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর খেটে খাওয়া মেহনতি কৃষক সন্তানদের ভাগ্যে সে সুবিধা জোটেনি।

ইউনিয়ন পর্যায়ে মাধ্যমিক শিক্ষা জাতীয়করণ শূন্যের কোটায়। এটাতো চরম হতাশার। কেননা রাষ্ট্রের সিংহভাগ মানুষের বসবাস এই জনপদে। কিন্তু আজ শিক্ষা জাতীয়করণের সুবিধায় এ জনপদটি বড়ই উপেক্ষিত। উন্নত রাষ্ট্রের স্বপ্ন বুনে আমরা শিক্ষায় অসমতা ও বৈষম্য   রাখতে পারি না। সরকার প্রধানের মত ছিল- শিক্ষায় কোন খরচ লাগবে না। কিন্তু সেই মতানুসারে বাস্তবায়নের গতি অত্যন্ত ধীর কিনা প্রশ্ন রয়েছে।

বেসরকারি  বিদ্যালয়ের হাওরে নেই হাওর ভাতা, পাহাড়ে নেই পাহাড়ি ভাতা অথচ নিয়োগ প্রদানে মুখ্য ভূমিকায় সরকার! অথচ বদলির মত অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকে সরকার এড়িয়ে যাচ্ছে। যা শিক্ষায়  বিরাট অস্থিরতার  ক্ষেত্র তৈরি করছে।

আজ দেশ কাঁপছে শিক্ষায় মানব সম্পদ উন্নয়ন সংকটে। কেননা বারবার শিক্ষা কাঠামো পরিবর্তন, আংশিক জাতীয়করণ এবং একই সিলেবাসের অধীনে পাঠ্যক্রমে শিক্ষকদের সরকারি বেসরকারি বলে বিভাজন, শিক্ষকদের সুবিধা প্রাপ্যতার ভিন্নতা এবং যোগ্য হওয়া অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণে বঞ্চিত রাখা। এসব নানাবিধ সমস্যা শিক্ষায় অসন্তোষ বাড়িয়ে তুলছে। আসলে শিক্ষকদের আর্থিক সংকটে রেখে  শিক্ষায় গবেষণা ও সুষ্ঠু পাঠদান আদৌ সম্ভব কি?

বেসরকারি শিক্ষকদের  ৫ শতাংশ দিয়ে ১০ শতাংশ কর্তন শিক্ষকদের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় আঘাত করা হয়েছে। অতিরিক্ত সুবিধা না দিয়ে ভাতাদি নামক বেতন স্কেলে কর্তন নামের ছুড়ি চালানো শিক্ষককে দৈন্যতায় ভোগানো ছাড়া আর কি?

রাষ্ট্র যদি শিক্ষা ও শিক্ষককে একই সঙ্গে এগিয়ে না নেই তাহলে শিক্ষার পূর্ণতা আশা করা বোকামি। তাই সমস্যা উত্তরণে মাধ্যমিক শিক্ষা জাতীয়করণ আবশ্যক।

তাই কাল বিলম্ব না করে মুজিববর্ষই হোক সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। যেখানে জাতীয়করণের মাধ্যমে মানুষের মৌলিকতার শিক্ষা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সার্বজনীন হবে এবং শিক্ষার প্রসার ঘটবে। সেই সঙ্গে বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা পাবে। জয় হবে মানবতার; স্মরণীয় রবে মুজিব বর্ষকাল।

লেখক: সহকারী শিক্ষক (সমাজ বিজ্ঞান) বাংগালপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়। 
অষ্টগ্রাম, কিশোরগঞ্জ।

bnbd-ads