করোনা আক্রান্ত এসএটিভির সাংবাদিক সীমান্তর আবেগঘন স্ট্যাটাস

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
১৪ মে ২০২০, বৃহস্পতিবার
প্রকাশিত: ০২:০০ আপডেট: ০৮:৩৭

করোনা আক্রান্ত এসএটিভির সাংবাদিক সীমান্তর আবেগঘন স্ট্যাটাস

করোনা ভাইরাসের এই প্রাদুর্ভাবে সেল্ফ-কোয়ারেন্টিনে থেকে সংবাদ সংগ্রহের কোনো উপায় নেই। তাই আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি নিয়েই মাঠে কাজ করে যেতে হচ্ছে সংবাদকর্মীদের। এরই মধ্যে কয়েকজন সাংবাদিক করোনা ভাইরাসের ছোবলে চলে গেছেন না ফেরার দেশে। আক্রান্ত হয়েছেন অনেক সাংবাদিক। তেমনি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া এসএটিভির এক সাংবাদিকের আবেগঘন স্ট্যাটাস পাঠকের সামনে তুলে ধরলাম।

‘আমি আক্রান্ত, তবে আল্লাহর রহমতে আগের চেয়ে ভালোর দিকে। সবাই দোয়া করবেন।’

আক্রান্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত আমি মাঠে-ঘাটে পেশাগত দায়িত্ব পালনে কাজ করেছি। সমাজের অসঙ্গতিগুলো যেমন তুলে এনেছি, তেমনি করোনাকালে রাজধানীর চিত্র তুলে ধরেছি এসএটিভির পর্দায়।

যেভাবে প্রতিনিয়ত বাইরে মানুষের মাঝে কাজ করছি তাতে ধরেই নিয়েছিলাম আজ বা কাল, আমি আক্রান্ত হবোই। কেননা চাইলেও আমাদের ঘরে থাকার সুযোগ নেই। আমাদের কাজের ধরণই এমন। অবশেষে তাই হলো।

গত ৩ মে সারারাত আমার ঘুম হয়নি। কেমন কেমন লাগছে। তবুও সেহরি খেয়ে শুয়ে পড়ি। সকাল ১০টায় অফিসে যাওয়ার পর পুরো শরীর ব্যাথা শুরু হয়। কিছুক্ষণ পর জ্বর চলে আসে। পরো শরীরে শীত অনুভব করছি। পরে ১টার দিকে ছুটি নিয়ে বাসায় চলে আসি।
পরে আমার সহকর্মী মিজান আহমেদের বড় ভাই জামালপুর সদর হাসপাতালের ডাক্তার খিজির আমহমেদ শিশির ভাই ভাইয়ের পরামর্শ্য নেই। 

                        বাবাকে দূর থেকে দেখছে হেদায়াতুল ইসলাম সীমান্তর শিশু কন্যা
তিনিও একজন আক্রান্ত রোগী ছিলেন। তিনি বললেন যেহেতু উপসর্গ দেখা দিয়েছে, সেহেতু উনি যে কোর্সগুলো করছেন আমাকে সেগুলো করার জন্য। ওনার দেয়া পরামর্শে সেগুলো শুরু করি। পাশাপাশি সিনিয়র সাংবাদিক ইউসুফ আলী ভায়ের পরামর্শে ঘরোয়া ট্রিটমেন্ট শুরু করি।

তার পর রাতে দেখি প্রচন্ড ব্যাথা আর জ্বর। এ সময় আমার স্ত্রী মাথায় পানি দিয়েছে। শরীরে মলম মালিশ করছে। তারপরও ব্যাথা কমছে না। সবাই মনে করেছি এমনিই জ্বর। পরে চিন্তা করলাম এভাবে থাকলে যদি করোনা হয় তাহলে পরিবারের সবাই আক্রান্ত হবে। তাই ৬ মে ভোর ৬টায় উঠে বিএসএমএমইউয়ে গিয়ে ১২২ নাম্বার সিরিয়ালে দাড়ালাম। প্রায় ১২টার দিকে চ্যাম্পল দিয় আসি। পরে রাত ১০ টার দিকে রেজাল্ট আসে আমার করোনা পজেটিভ। সেই মুহুর্তটাই ছিল সবচেয়ে কঠিন। কতোটা কঠিন, তা লিখে বা মুখে বলে বোঝানো যাবে না। কেবল তারাই অনুভব করতে পারবে, যারা এর মুখোমুখি হবে। নিশ্চয়ই সৃষ্টিকর্তা সে পরীক্ষায় যেন আর কাউকে দাড় না করায়।

বাসার সবাইকে যখন বলি তোমরা সবাই পাশের রুমে চলে যাও, আমি রুমে একা থাকবো। তখন সবাই কান্না শুরু করলেন। মাকেতো কোনোভাবেই বুঝানো যাচ্ছে না। আমার কিছুই হয়নি। পরে আবার খিজির ভাইয়ের সাথে কথা টেলিমেডিসিন নিলাম। ডাক্তারদের পরামর্শে ঔষধ ও নিয়ম-কানুনগুলো কঠোরভাবে মানতে শুরু করি।

দুই দিন পর আমার স্ত্রীরও গলা ব্যাথাসহ উপসর্গ দেখা দেয়। তাতে আমি আরো ভেঙ্গেপড়ি।
এমন খবর পেয়ে এসএটিভির হেড অফ নিউজ, মাহমুদ আল ফয়সাল, সিএনই জাহিদুর রহমান খানসহ সকল বিভাগের কর্মকর্তারা আমার জন্য চিন্তিত হয়ে পড়েন। সবাই নিয়মিত আমার খবর নিচ্ছেন দোয়া করছেন। আমার সহকর্মী এসকে সৌরভ এবং তাইফু রহমান তুহিন বাজার নিয়ে, ঝুঁকি নিয়েই আমার বাসার সাততলায় পৌছে দিয়েছেন। দুর থেকে আমাকে একটু দেখেও গিয়েছেন। তারাসহ অফিসের প্রসাশনিক কর্মকর্তাসহ আমার সকল সহকর্মী সবার প্রতি কৃতঙ্গতা। সবাই এই অবস্থায় আমাকে প্রেরনা দিয়েছেন। কি কি লাগবে সবাই জানতে চেয়েছেন।

পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সংবাদকর্মী, সাংবাদিক নেতারা নিয়মিত খবর নিচ্ছেন ফেইসবুকে। নগর উন্নয়ন সাংবাদিক ফোরামের সকল সদস্যদেরর প্রতি আমি এবং আমার পরিবার কৃতঙ্গ। সাংবাদিক সাহেদ শফিক, সায়ীদ আবদুল মালিক, সামসুজ্জামান নাঈম সবার প্রতিও আমি কৃতঙ্গ।

বিশেষ করে এসএটিভির কর্ণধার প্রিয় এমডি স্যার জনাব সালাহউদ্দিন আহমেদের অনুপ্রেরনা, দোয়া,ভালবাসা, সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। শুরু থেকেই তিনি আমার এ অবস্থায় এতবেশি খোজ খবর নিচ্ছেন। আমার সুস্থতার জন্য প্রেরনা জুগিয়েছেন। পাশাপাশি এসএটিভির পরিচালক জনাব নুরে আলম রুবেল সাহেবও আমার খোজ নিয়েছেন, প্রেরনা জুগিয়েছেন আমি সারা জিবন কৃতজ্ঞ থাকবো এসএটিভি পরিবারের প্রতি। এ দুর্যোগকালে আমার পরিবারের পাশে দাড়িয়েছেন। আল্লাহ অনাদের নেক হায়াত দান করুন।

আমার জ্বরটা এখন দিনে থাকে না, রাতে সামান্য আসে। তবে কাশি আছে। এর পরও আমি মনে করি, আমি বেশ ভালো আছি। ফলে আমরা মনে করি, উপসর্গ থাকার পরও আমাদের হাসপাতালে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি এখনও তৈরি হয়নি। আর নিজের ভিতরে হাসপাতালের ব্যপারে একটু ভয়ও কাজ করে তাই হাসপাতালের চেয়ে বাসায় থাকাটাই মঙ্গল মনে করছি। বর্তমানে আমি এবং আমার পরিবার আগের চেয়ে একটু ভালোর দিকে আছি। সবাই দোয়া করবেন। যেন তাড়াতাড়ি সুস্থ্যহয়ে আবারও কাজে যোগদান করতে পারি।

আমাদের দুজন এবং আমার একমাত্র কণ্যার সেবা করছে আমার মা জননী। আল্লাহর কাছে আশেষ শুকরিয়া আমার মাকে তিনি ভাল রেখেছেন।

আমার এ অবস্থায় শত শত ফোন এবং ম্যাসেজের রিপ্লাই দেওয়া সম্ভব নয়। তবুও যতটুকু পেরেছি সবার সাথে কথা বলার চেস্টা করেছি। কারণ সবাই আমি এবং আমার পরিবারকে নিয়ে উৎকন্ঠায় আছেন।আল্লাহ সবাইকে ভালো রাখুন। করোনা মুক্ত রাখুন। আমিন। (লেখা: করোনা আক্রান্ত এসএটিভির প্রতিবেদক হেদায়াতুল্লাহ সীমান্ত)

ব্রেকিংনিউজ/এসপি

bnbd-ads