‘সেবার মানসিকতা নিয়েই পুলিশে এসেছি’

তৌহিদুজ্জামান তন্ময়
২৮ অক্টোবর ২০২০, বুধবার
প্রকাশিত: ০৭:১৮ আপডেট: ০১:২৫

‘সেবার মানসিকতা নিয়েই পুলিশে এসেছি’

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের শেরেবাংলা নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানে আলম মুন্সী। মাদারীপুরের এই কৃতি সন্তান ২০০৪ সালে পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেন। মেধাবী এই পুলিশ কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) হিসেবে তেজগাঁও থানায় যোগদান করেন। এরপর তিনি বিদেশে মিশন শেষ করে ধাপে ধাপে পদোন্নতি লাভ করেন। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি, ডিবিসহ কয়েকটি থানায় ওসি হিসেবে সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে শেরেবাংলা নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। 

ব্যক্তি জীবনে তিনি এক ছেলে ও এক মেয়ের বাবা। তার সহধর্মিনীও পুলিশের ভিক্টিম সাপোর্ট সেন্টারের ইনেস্পেক্টর হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। শেরেবাংলা নগর থানায় যোগ দিয়ে চমক দেখান। নিয়ন্ত্রণে আনেন দালাল চক্র, ধ্বংস করে দেন মাদকের আকড়া। নির্মূল করেন কিশোর গ্যাংও ছিনতাই-ডাকাতি। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে দ্রুত অপরাধী শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে তার থানার রয়েছে ঐতিহ্য। পুলিশে যোগ দেয়ার পর থেকেই জানে আলম মুন্সী দেশ ও দেশের মানুষের জন্য নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। 

সম্প্রতি দেশের জনপ্রিয় অনলাইন নিউজপোর্টাল ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি-এর মুখোমুখি হন এই চৌকস পুলিশ কর্মকর্তা। তার সঙ্গে দীর্ঘ আলাপচারিতায় উঠে আসে শেরেবাংলা নগর থানার বর্তমান আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, করোনাকালীন মানবিক পুলিশ হিসেবে দৃষ্টান্ত ও ব্যক্তিগত আর কর্মজীবনের নানা অজানা দিক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ব্রেকিংনিউজের স্টাফ করেসপন্ডেন্ট তৌহিদুজ্জামান তন্ময়-

ব্রেকিংনিউজ: আপনি বর্তমান কর্মস্থলে যোগদানের আগে এই থানার সেবার মান বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কেমন ছিলো।

জানে আলম মুন্সী : থানার সেবার মানকে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করতে চাচ্ছি না। শেরেবাংলা নগর থানায় যোগদান করার পর থেকে যথেষ্ট চেষ্টা করেছি এলাকার মাদক নিয়ন্ত্রণে রাখতে। কিশোর গ্যাং নির্মূল করতে অনেকটা সফল হয়েছি। দায়িত্ব নেওয়ার পর এলাকায় কোনও চাঞ্চল্যকর খুন বা ডাকাতির ঘটনা ঘটেনি। দু'একটা যা ঘটেছে তা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। সেগুলো তাৎক্ষণিক চিহ্নিত করেছি। শেরেবাংলা নগর থানায় মাদকের সেবন-সরবরাহ অনেকটা শূন্যের কোঠায়। এক সময়ের ক্রাইম জোন হিসেবে পরিচিতি থাকলেও এখন এলাকায় ক্রাইমের কিছুই নেই বললেই চলে। সবই স্বচ্ছ। এছাড়াও এখানে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে দালালের দৌরাত্ম্য ছিল। বর্তমানে দালালদের প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে না।

ব্রেকিংনিউজ : করোনা মোকাবিলায় ‘সম্মুখযোদ্ধা’ হিসেবে শুরু থেকেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেছেন। করোনাকালীন অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বলুন-

জানে আলম মুন্সী : করোনার ক্রান্তিকালে একমাত্র পুলিশই মাঠে ছিল। অনেকেই করোনা রোগীর পাশে যেত না। কিন্তু পুলিশ সব সময় এগিয়ে গিয়েছে। আমার থানা এলাকা একটি হাসপাতাল প্রধান এলাকা। করোনাকালে এখানে প্রচুর রোগী আসতো। সে সময় অন্যান্য পুলিশ অফিসারসহ আমাকে প্রতিদিন একাধিকবার হাসপাতালে যেতে হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য পরামর্শ দেয়া হতো। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার অনুরোধ জানানো হয়েছে। জনসচেতনতায় এলাকায় মাইংকিং করানো হয়েছে। এছাড়া মানুষকে ত্রাণ দেয়ায় সাহায্য করেছি, কোথাও কোথাও নিজেরাও দিয়েছি, মধ্যবিত্ত পরিবারের যারা হাত পাততে পারতো না তাদের বাসায় গিয়ে রাতের আধারে সাহায্য পৌঁছে দিয়েছি। করোনায় মৃতদেহ দাফনের উদ্যোগও পুলিশ নিয়েছে।

একটি বিষয় আমাদের আবেগ আপ্লুত করে, যেখানে মানুষকে বলছি ঘরে থাকুন, আমি কিন্তু বাইরে। আমার ছেলে-মেয়ে আমাকে প্রশ্ন করত- 'বাবা তুমি মানুষকে ঘরে থাকতে বলছ আর তুমি নিজেই উল্টো ঘরে থাকছো না।' হয়তো সে বাচ্চা মানুষ; না বুঝে বলছে, কিন্তু সে জ্ঞানী কথাটাই বলছে। এমন একটা দ্বিমুখী আচরণ হয়ে যাচ্ছে শুধু পেশার জন্য। আমরা মাঠে ছিলাম বলেই যে দেশ ভালো আছে তা-নয়, এলাকাবাসীরাও আমাদেরকে সহযোগিতা করেছেন। সেই সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি সংস্থার অবদান ছিল। যার জন্য আজ আমরা মোটামুটি ভালো পর্যায়ে আসছি পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর মতো ততটা মহামারি আকার ধারণ করেনি।

ব্রেকিংনিউজ : ভিডিও ফুটেজ দেখে অপরাধী শনাক্তকরণে আপনার থানার ভূমিকা কি?

জানে আলম মুন্সী : গুরুত্বপূর্ণ কোনও ঘটনা যখন ঘটে তখন আমরা সেই ঘটনার ক্লু আবিষ্কার করার চেষ্টা করি। তার বড় একটা অংশ হচ্ছে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ। ডিএমপি কমিশনার স্যারের পক্ষ থেকে এবং সেন্ট্রালি কিছু সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা আছে। এছাড়াও ব্যক্তি মালিকাধীন মার্কেট, বাসা কিংবা অফিসে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করার জন্য উঠান বৈঠক করেছি। এখন অনেক জায়গায় সিসি ক্যামেরা আছে। কিছুদিন আগে তরুণ পর্বতারোহী রেশমা নাহার রত্না নিহতের মামলা তদন্তে করতে গিয়ে প্রায় ৩৮০টি সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে আসামি শনাক্ত করতে হয়েছে। এছাড়াও গত মাসে থানা এলাকায় একটি খুন হয়। খুনের ঘটনায় সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে চার আসামি গ্রেফতার করা হয়। 

ব্রেকিংনিউজ : আপনি তো একজন স্বপ্নবাজ মানুষ, স্বপ্ন দেখতে ও স্বপ্ন দেখাতে পছন্দ করেন। শত ব্যস্ততার মাঝেও কিভাবে স্বপ্নের কাজগুলো বাস্তবায়ন করেন?

জানে আলম মুন্সী : প্রত্যেক মানুষেরই স্বপ্ন থাকে। নিজ নিজ কর্মের জন্য কিছু স্বপ্ন তৈরি করি। করোনার ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি যখন ধারণ করলো তখন মানুষকে ঘরে রাখার জন্য ছাদ বাগান কিংবা মাছ চাষ পদ্ধতি মানুষকে দেখানোর জন্য করেছি। যাতে আপনিও ইচ্ছা করলে করতে পারেন। এটা খুব বেশি কঠিন কিছু নয়। ইচ্ছা করলেই করা সম্ভব। লকডাউনে অপরাধের পরিমাণ কম ছিল, মামলা-মোকদ্দমার পরিমাণও তুলনামূলক কম ছিল সেকারণে আমি সময় পেয়েছি অনেক। সময়টাকে কাজে লাগানোর জন্য এই কাজগুলো করেছি। কমার্শিয়াল নয় ব্যক্তিগত কারণে আমি একটি ইউটিউব চ্যানেল খুলেছিলাম (bit.ly/2T5kFEG) করোনার সময়। চ্যানেলটিতে ভিন্নধর্মী কিছু আইটেম রাখার চেষ্টা করেছি। এছাড়াও থানায় দেখেছেন মানুষের সেবার মান নিশ্চিত করার জন্য কিছু পদক্ষেপ নিয়েছি। আমার থানায় প্র্যতেকটি জিনিস সাজানো-গোছানো। এখানে আলাদা আলাদা নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধী ডেস্ক রয়েছে।

এছাড়াও সার্বক্ষণিক সিসি ক্যামেরায় মনিটরিং করা হয়। স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য থানায় জিমের ব্যবস্থা রয়েছে এবং বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা রয়েছে। ছাদে যেহেতু জায়গা আছে তাই বাগান করেছি; মানুষ যাতে ফ্রেশ বাতাস পান, মন সজীব থাকে। এটা দেখে যেন অন্যান্যরাও শেখে। এছাড়াও বাংলাদেশের থানার মধ্যে একমাত্র শেরেবাংলা থানাতেই লিফটের ব্যবস্থা রয়েছে। খুব শিগরই লিফটি উদ্বোধন করা হবে। থানার স্টাফ নিয়ে প্রতি ১৫ দিনে ও প্রতি মাসে মিটিং করা হয। তাদের শেখানো হয় থানায় সেবার মান যেন নিশ্চিত হয়। বর্তমান আইজিপি স্যার আসার পর থেকে এবং ডিএমপি কমিশনার স্যারের নির্দেশে জিরো টলারেন্স দুর্নীতিতে মাঠে এবং থানায় কাজ করে যাচ্ছি।

ব্রেকিংনিউজ : জনগণের উদ্দেশ্যে আপনার বার্তা কি?

জানে আলম মুন্সী : বাংলাদেশ একটি মধ্য আয়ের দেশ। জনগণের উচিত শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকা। যদি আপনি আইন না মানেন, আইনকে সম্মান না করেন তাহলে পুলিশের পক্ষে এমনকি কোনও বাহিনীর পক্ষে আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব নয়। আগের যুগের মানুষের সঙ্গে যদি তুলনা করতে যাই, এখন মানুষের মায়া মমতা কমে যাচ্ছে এবং মানুষ হিংস্র হয়ে যাচ্ছে। এর কারণ হচ্ছে নীতি নৈতিকতার অভাব, ধর্মীয় শিক্ষার অভাব। মানুষের আগে যে বংশগত শিক্ষা ছিল, পারিবারিক শিক্ষা ছিল এখন তা আর নেই বললেই চলে। পরিবার থেকে মানুষ তৈরি করে দিতে হবে। যদি পরিবার থেকে মানুষ তৈরি হয়ে না আসে পুলিশ কোনও মানুষকে সেভাবে তৈরি করে দিতে পারবে না। 

আমাদের কথা হচ্ছে- আপনি আপনার জায়গাটুকু মাদকমুক্ত রাখেন, সন্ত্রাসমুক্ত রাখেন, আপনার অফিস, আপনার বাসা, আপনার সমাজ, আপনার এলাকা, আপনার শহর এভাবে দেখলে পুরো বাংলাদেশ ভালো হয়ে যাবে। নিজের ভাগ্য, নিজের উন্নতি বদলাতে হলে নিজেকেই পরিবর্তন করতে হবে, অন্যের উপর নির্ভর করলে হবে না। বর্তমান ডিজিটাল বাংলাদেশের যুগ। বেশিরভাগ ছেলে-মেয়েদের কাছে স্মার্টফোন কিংবা ল্যাপটপ, কম্পিউটার থাকে। তারা এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করে কি করে। কোন ওয়েবসাইটে ঢুকছে এগুলো বাবা-মায়ের লক্ষ্য করতে হবে। সন্তানকে ফেসবুক আইডিতে কি আছে, কি দিচ্ছে এগুলো বাবা-মায়ের লক্ষ্য করতে হবে। নাহলে ধীরে ধীরে খারাপ অবস্থায় চলে গেলে সেখান থেকে ফেরানো সম্ভব না। করোনায় সময়ে প্রচুর ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের অভিযোগ আসছে, পারিবারিক কলহ, বাবা-ছেলে দ্বন্দ্ব, মা-মেয়ে দ্বন্দ্ব, ভাইয়ে ভাইয়ে দ্বন্দ্ব এগুলো এতো পরিমাণ বেশি আসছে যে মানুষের নৈতিক অবক্ষয় ঘটেছে। 

আমি একটি ইন্টারন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করতাম। সেখান থেকে পুলিশে এসেছি। সেবার মানুষিকতা নিয়ে পুলিশে এসেছি। সত্য ও ন্যায়ের পথে কাজ করে যাবো, ইনশাআল্লাহ।

ব্রেকিংনিউজ : আপনার মূল্যবান সময় দেওয়ার জন্য ব্রেকিংনিউজ পরিবারের পক্ষ থেকে আপনাকে ধন্যবাদ।

জানে আলম মুন্সী : আপনাকে ও ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি পরিবারকেও ধন্যবাদ।



ব্রেকিংনিউজ/টিটি/এমএইচ/এম

bnbd-ads