রাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, প্রতিহিংসা নয়

রাহাত হুসাইন
৪ অক্টোবর ২০২০, রবিবার
প্রকাশিত: ১১:১৪ আপডেট: ০৬:১৩

রাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, প্রতিহিংসা নয়

এস এম কামাল হোসেন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। তিনি সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে রাজশাহী বিভাগের দায়িত্বে রয়েছেন। ছাত্রলীগের মধ্য দিয়েই রাজনীতিতে হাতেখড়ি তার। ৯০ এর দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা ছিলেন। গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী জন্মভিটা হলেও তিনি বেড়ে উঠেছেন খুলনায়। সেখানেই পড়ালেখা ও রাজনীতির শুরু। 

সম্প্রতি দেশের জনপ্রিয় অনলাইন গণমাধ্যম ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি-এর মুখোমুখি হন এই রাজনীতিক। তার সঙ্গে আলাপচারিতায় উঠে আসে আওয়ামী লীগের রাজনীতির অতীত-বর্তমান ও সমসাময়িক নানা তথ্য-উপাত্ত। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ব্রেকিংনিউজের স্টাফ করেসপন্ডেন্ট রাহাত হুসাইন।

ব্রেকিংনিউজ: একজন রাজনীতিবিদের মূল লক্ষ্য কী হওয়া উচিত বলে মনে করেন?

কামাল হোসেন : রাজনীতিবিদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে মানুষের কল্যাণে কাজ করা। অনেকেই বলে থাকেন করোনার সময় রাজনৈতিক কোনও কর্মকাণ্ড ছিল না। আমি মনে করি করোনার সময় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সবচেয়ে বেশি ছিল। রাজনীতিবিদদের উদ্দেশ্য হচ্ছে বিপদে-আপদে দুঃসময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো। সে ক্ষেত্রে আমরা মনে করি, জননেত্রী শেখ হাসিনা সেই উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। তাঁর নির্দেশে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তবে হ্যাঁ, সাংগঠনিক কার্যক্রম বন্ধ ছিল। তবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কিন্তু আমাদের ঠিকই ছিল।

ব্রেকিংনিউজ : জেলা-উপজেলায় বলয়ভিত্তিক রাজনীতি ভাঙতে আপনি কোন ধরনের উদ্যোগ নেবেন?  

কামাল হোসেন : আমি কোনও উপজেলায় কিংবা সংসদীয় এলাকায় কাউকে একছত্র আধিপত্য বিস্তার করতে দেবো না। আমি সবাইকে নিয়ে সমন্বয় করার জন্য কাজ করে যাবো। কেন্দ্রীয় নেতারা যদি গ্রুপিং করে; তাহলে গ্রুপ তৈরি থাকবে। কেন্দ্রীয় নেতারা যদি গ্রুপ না করে; শেখ হাসিনা যা বলে দেন, এ নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করলে গ্রুপ হবে না। সমস্যার সমাধান হবে। আওয়ামী লীগে প্রতিযোগিতা থাকবে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, কিন্তু প্রতিহিংসা নয়। আমরা যেকোনও ধরনের প্রতিহিংসা বন্ধের চেষ্টা করছি। আওয়ামী লীগের সৃষ্টির শুরু থেকেই  প্রতিযোগিতায় আছে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে। আমি প্রতিযোগিতা-প্রতিদ্বন্দ্বিতা পছন্দ করি। গ্রুপিংও পছন্দ করি, কিন্তু প্রতিহিংসা পছন্দ করি না।

আমি মনে করি, একটি নির্বাচনী এলাকায় ৫ জন ১০ জন প্রার্থী থাকতেই পারে। কিন্তু ওই ৫ জন ১০ জন প্রার্থী একসঙ্গে গিয়ে দলকে সংগঠিত করবে। জননেত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়নের কর্মকাণ্ড মানুষের নিকট তুলে ধরবে। জনমত তৈরি করবে। মনোনয়ন ১০ জন চাইতে পারে। মনোনয়ন বোর্ড ও নেত্রী যাচাই-বাছাই করে যাকে মনোনয়ন দেবেন আমরা তার পক্ষেই কাজ করবো। আমি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে কারও প্রতি দুর্বলতা প্রকাশ করলে অন্যরা আমাকে একটি পক্ষের নেতা মনে করবে। এই দলে একমাত্র নেতা হচ্ছেন শেখ হাসিনা। আমরা তাঁর কর্মী। তৃণমূলে তাঁর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করাই হচ্ছে আমাদের মূল দায়িত্ব।

ব্রেকিংনিউজ : কমিটি করার ক্ষেত্রে ত্যাগীদের জায়গা দেয়ার ব্যাপারে বারবার বলা হচ্ছে; আসলে ত্যাগীরা কতটুকু জায়গা পাচ্ছেন?

কামাল হোসেন : আমরা কমিটি করার ক্ষেত্রে, মাদকের সাথে যারা জড়িত, চাঁদাবাজ, যাদের গ্রহণযোগ্যতা নাই বা বিভিন্ন দল থেকে আসা সুবিধাবাদীদের নেতা বানাচ্ছি না। আমাদের জানামতে এ ধরনের লোকদের কমিটিতে রাখছি না। অনেক জেলার লোকদের তো আমরা চিনি না। জেলা কমিটির প্রেসিডেন্ট-সেক্রেটারি প্রস্তাব দিলে আমরা তদন্ত করে সেটাকে বাদ দেয়ার চেষ্টা করি। আমি ব্যক্তিগতভাবে যেটা মনে করি, নেত্রীর দিকনির্দেশনা অনুযায়ী ২০০১ সাল থেকে ২০০৬ বা ২০০৮ সাল পর্যন্ত যারা রাজপথে লড়াই করেছে, দুঃসময়ে আওয়ামী লীগের হাল ধরেছে, সেসব লোকগুলোর বিরুদ্ধে যদি কোনও মাদক-চাদাঁবাজির মামলা না থাকে এই আমলে; বা তাদের কারণে যদি দলের কোনও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন না হয়ে থাকে, তবে ওই লোকগুলোকে আমরা দলে স্থান দেয়ার চেষ্টা করি। ব্যক্তিগতভাবে আমি চেষ্টা করি। 

নেত্রীর নির্দেশ আমি অক্ষরে অক্ষরে পালন করার চেষ্টা করি। তারপরও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করে বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনাকে পছন্দ করে শ্রদ্ধা করে- এই ধরনের লোক যারা আওয়ামী লীগের কোনও পদে নেই, কিন্তু সমাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত, সমাজে তার অবস্থান আছে, মানুষ ঐ ব্যক্তিকে পছন্দ করে, এ রকম লোক কমিটিতে থাকতে চাইলে, আমরা রাখার ব্যবস্থা করি। আমাদের দরকার হচ্ছে একজন ভালো মানুষ। যিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করেন। তাকে দলে টেনে আনা। আমাদের তো লোকসংখ্যা বাড়াতে হবে; ভোটের সংখ্যা বাড়াতে হবে। তবে কোনও খারাপ লোক, সুবিধাবাদী লোক, কিংবা কোনও দলের মাস্তান ছিল, অথবা জামাত-শিবির সাথে জড়িত ছিল এদেরকে কোনও অবস্থায় দলে জায়গায় দেবো না। 

ব্রেকিংনিউজ: মুজিবকোট পরে অনেকে নানা ধরনের অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছে, মুজিবকোটের অপব্যবহার বন্ধে বিধি-নিষেধ হলে কেমন হয়?

কামাল হোসেন : একটা মানুষ আওয়ামী লীগ করে না, কিন্তু সে বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনাকে ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করে। সে বঙ্গবন্ধুকে ভালোবেসে মুজিবকোট পড়লে; তাকে তো আমি নিষেধ করতে পারি না। তবে কিছু লোক আছে; যারা সুবিধাবাদী-টাউট। তারাও মুজিবকোট পরে। তাদের তো চিহ্নিত করা কঠিন। আমি যদি একেবারেই বন্ধ করে দেই মুজিবকোট আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা এছাড়া, জেলার প্রেসিডেন্ট-সেক্রেটারী ছাড়া, উপজেলার প্রেসিডেন্ট-সেক্রেটারী ছাড়া পরতে পারবে না তাহলে ওই যে সাধারণ লোকটা, বঙ্গবন্ধুর প্রতি যার অগাধ ভালোবাসা যে কোনও কিছু চায় না দলের থেকে সে শুধু বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনাকে ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে, চেতনাকে ধারণ করে মুজিব কোট পরে, ওই লোকটা কিন্তু তখন ভীষণ কষ্ট পাবে। তার বিশ্বাস জায়গায় আঘাত লাগবে। এটা বন্ধ করা ঠিক হবে না বলে আমি মনে করি। তবে দল যদি বন্ধ করে সেটা আলাদা বিষয়। দলের সিদ্ধান্ত মেনে নেব। মুজিবকোট ব্যবহার করে কিছু সুবিধাবাদী আছে। তারা সবসময়ই মুজিবকোট পরে। এদের চিহ্নিত করা কঠিন। মুজিবকোট ব্যবহারের বিধিনিষেধ আরোপ করা ঠিক হবে না বলে আমি মনে করি।

আমি একটা উদাহরণ দেই, খুলনার শরণখোলার ছাত্তার ভাই। ৭৫ সালের পর থেকে প্রতিটি মিছিল-মিটিংয়ে গিয়েছে, অনেকবার মার খেয়েছে, সে কিছুই চায় না দল থেকে। আওয়ামী লীগের জাতীয় নেতারাও তাকে চিনে। সে শেখ মুজিবকোট পড়ে ঘুরে বেড়ায়। মুজিবকোট পরা বিধি নিষেধ আরোপ করলে এই লোকটা কষ্ট পাবে। এরকম অনেক লোক আছে যারা বঙ্গবন্ধুর পাগল, শেখ হাসিনার পাগল। শেখ হাসিনার কিছু হলে হাউমাউ করে কাঁদে। শেখ হাসিনার সঙ্গে তার জীবনে দেখা হব না। আমরা যারা প্রতিদিন শেখ হাসিনার সাথে দেখা করি আমরাও এরকম কষ্ট পাব না। তার অনেক কষ্ট পাবে শেখ হাসিনার কিছু হলে। এ ধরনের লোক আছে বলেই আমরা টিকে আছি।

ব্রেকিংনিউজ : আপনার জন্মস্থান গোপালগঞ্জ কিন্তু আপনারা রাজনীতি খুলনা থেকে শুরু এই বিষয়ে জানতে চাচ্ছি?

কামাল হোসেন : খুলনায় যারা পলিটিক্স করে; তাদের কারো বাড়ি গোপালগঞ্জ, কারো বাড়ি বরিশাল। গ্রেটার ফরিদপুর-গ্রেটার বরিশাল; বাগেরহাট, খুলনা, এমনকি চিটাগং ডিভিশনের লোকও এখান পলিটিক্স করে। আমি খুলনা সিটি কলেজে লেখাপড়া করেছি। সিটি কলেজে ছাত্রলীগের সেক্রেটারি ছিলাম। পরবর্তীতে ছাত্রলীগের ডিভিশন হল। তখন আমি মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলাম। এর আগে মহানগর ছাত্রলীগের সেক্রেটারী ছিলাম। এখান থেকে আমি খুলনার রাজনীতিতে প্রবেশ করি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যার করার পর সেই দুঃসময়ে খুলনা ছাত্রলীগ করা খুব কঠিন ছিল। আমরা কয়েকজন ছাত্রনেতা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ঘুরে ঘুরে ছাত্রলীগ সুসংগঠিত করি। পরবর্তীতে ছাত্রলীগের ভিতর দ্বিধাবিভক্তি হওয়ার কারণে, আমি জাতীয় ছাত্রলীগের প্রেসিডেন্ট হই খুলনার। আজকে যে মহানগরীর সেক্রেটারি বাবুল রানা, উনারা আমরা একসাথে ছাত্রলীগ করতাম। খুলনায় আমার নিজের জায়গা আছে, বাড়ি আছে, আমি খুলনার ভোটার। এভাবে আমি খুলনায় রাজনীতি শুরু করি। খুলনায় আমার অবস্থান আছে; কিনা। সেটা খুলনার মানুষ বিবেচনা করবে। এখন আমি খুলনা বেল্টে পলিটিক্সটা করি, যেহেতু আমি খুলনার ভোটার।  

ব্রেকিংনিউজ : খুলনার জেলা কমিটি সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পৃথক পৃথক কমিটি জমা দিয়েছে; এ বিষয়ে কতটুকু জানেন?

কামাল হোসেন : খুলনা ডিভিশন দেখার দায়িত্ব হচ্ছে জয়েন্ট সেক্রেটারি বাহাউদ্দিন নাছিম আর সাংগঠনিক সম্পাদক  বিএম মোজাম্মেলের। তাদের দুজনের দেখার দায়িত্ব। বাহাউদ্দীন নাছিম অসুস্থ ছিলো; বিএম মোজাম্মেল তাদের নিয়ে বসেছে।  আমি তখন নওগাঁ গিয়েছিলাম; নওগাঁ থেকে আসার পর বিএম মোজাম্মেল আমাকে বললেন, একটু সহযোগিতা করেন, আমি তাকে সহযোগিতা করার জন্য তার বাসায় বসে ছিলাম; জেলার নেতাদের নিয়ে। সেখানে আলোচনার ভিত্তিতে একটি কমিটি দাঁড় করানো হয়েছে; যা প্রস্তাবিত। তাদের দুজনের দিয়ে যাওয়া কমিটিতে কিছু বিতর্তিক লোক রয়েছে। সেই তালিক বিএম মোজাম্মেল সাহেবের কাছে আছে। উনি যাচাই-বাছাই করে, পরে যদি আমার সাহায্য নেয়, আমি তাকে সাহায্য করবো।  যারা অরিজিন, যাতে কোনো বিতর্কিত না থাকে। উনার সাথে আমার কথা হয়েছে উনি যাচাই-বাছাই করছেন, যাতে কোনও বিতর্কিত লোক না থাকে। এ ব্যাপারে ওনার সাথে আমার কথা হয়েছে। উনি যাচাই-বাছাই করছেন, খোঁজখবর নিয়ে একটা কমিটি জমা দেবেন।

ব্রেকিংনিউজ : সময় দিয়ে কথা বলার জন্য ধন্যবাদ।

কামাল হোসেন : আপনাকে ও ব্রেকিংনিউজ পরিবারকেও অসংখ্য ধন্যবাদ।

ব্রেকিংনিউজ/আরএইচ/এমআর 

bnbd-ads