করোনা কীট: অর্থসংকটে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের উদ্ভাবন যেন থেমে না যায়

এস এম আতিক হাসান
২২ মার্চ ২০২০, রবিবার
প্রকাশিত: ০৩:০৫ আপডেট: ০৬:০৩

করোনা কীট: অর্থসংকটে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের উদ্ভাবন যেন থেমে না যায়

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। একজন মুক্তিযোদ্ধা, প্রখ্যাত চিকিৎসক, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি। ১৯৪১ সালের ২৭ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করা জাতির এই শ্রেষ্ঠ সন্তান ১৯৮২ সালে প্রবর্তিত বাংলাদেশের ‘জাতীয় ঔষধ নীতি’ ঘোষণার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। সম্প্রতি বিশ্বের মহামারি আকার ধারণ কারা মরণঘাতি করোনা ভাইরাস শনাক্তের কীট উদ্ভাবন করে প্রশংসা কুড়িয়েছেন। কোভিড–১৯ পরিস্থিতিতে তিনি ব্রেকিংনিউজের মুখোমুখি হন। করোনা মোকাবিলার বিষয়ে সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ব্রেকিংনিউজের সিনিয়র স্টাফ করেসপন্ডেন্ট এস এম আতিক হাসান। ক্যামেরায় ছিলেন সালেকুজ্জামান রাজীব।

ব্রেকিংনিউজ: করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতি কিভাবে মূল্যায়ন করবেন।

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, মহামারি আকার নেওয়া ভাইরাস মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতি পর্যাপ্ত না। প্রথম থেকেই চীনা দূতাবাস বলেছিল বিমানবন্দরে সবাইকে চেক আপ করা উচিত। কিন্তু সরকার সঠিক সময়ে সেটা করতে পারেনি। সঠিক সময়ে পদক্ষেপ নিলে হয়তো করোনা ঝুঁকি কিছুটা কমানো যেত।

ব্রেকিংনিউজ: করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় রাজনৈতিক দলগুলো কী ভূমিকা পালন করছে। তাদের সঠিক ভূমিকা কী হওয়া উচিত?

ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী: সরকার সবচেয়ে বড় ভুল করেছে এই সময়ে এই উপ-নির্বাচনের আয়োজন করে। সংকট মুহূর্তে এ নির্বাচন না দিলেও পারতো। এটা একটি ভুল কাজ করছে সরকার। এটার কোন প্রয়োজন ছিলো না। নির্বাচন কমিশন যে একটি অথর্ব ব্যক্তি তা প্রমাণ করলো। একদিকে বলতেছে লোকজন জড়ো হবে না অন্যদিকে বলতাছে ভোট দিতে আসো। সরকারের উচিত সবাইকে উদ্ধার্ত আহ্বান জানানো সব রাজনৈতিকদলের প্রতিনিধিকে নিয়ে জাতীয় কমিটি গঠন করা উচিত। এখানে সরকারের উদারতার দরকার আছে। সরকার এখানে একা কাজ করতে পারবে না। তার জন্য জনগণকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে হবে। এবং আমাদের সকলের উচিত সরকারকে সহযোগিতা করা। সরকারেরও উচিত হবে জনগণকে সাথে নিয়ে কাজ করা। 

তবে একটি ভালো কাজ করেছে সরকার আমাদের করোনা কীট উদ্ভাবনের খবর শুনে প্রধানমন্ত্রীর (পিএম) অফিস থেকে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। শনিবার সাপ্তাহিক বন্ধ থাকা সত্ত্বেও তাদের অফিস খোলা রেখে কাজ করছে।

ব্রেকিংনিউজ: যারা করোনা রোগীর চিকিৎসা দেবেন তাদের জন্য কি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত?

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী: যারা করোনা ভাইরাসের চিকিৎসা দেবেন তাদের তিনটি জিনিস দরকার একটা মাস্ক থাকতে হবে, হ্যান্ড গ্লাভস থাকতে হবে, গ্রাউন্ড থাকতে হবে। চিকিৎসকদের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। আর গ্লাভসে সরকারের নির্ধারিত ৫৮ শতাংশ ট্যাক্স উঠিয়ে দিতে হবে। থার্মোমিটার ও ভেন্টিলেটর এর ওপর কর উঠিয়ে দিতে হবে। সোজা কোথায় মেডিকেল ইকুইপমেন্ট এর  টেক্স জিরো ঘোষণা করতে হবে। ডাক্তার ও নার্সদের ট্রেনিং দিতে হবে ভয় পাওয়া চলবে না। রসুলের বাণীকে স্মরণ করিয়ে দিতে হবে যে মহামারি থেকে পালিয়ে যাওয়া মানে জিহাদের ময়দান থেকে পালিয়ে যাওয়া সুতরাং ডাক্তার এই রোগ দেখে ভয় পেলে চলবে না।

ব্রেকিংনিউজ: করোনা ভাইরাস পরীক্ষার জন্য আপনারা একটা কিট আবিষ্কার করছেন এটা সম্পর্কে যদি বলতেন?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: করোনা নির্ণয়ের একটি মাত্র পদ্ধতি ছিল। সেটি হলো পিসিআর পদ্ধতি। তবে পদ্ধতিটা অনেক ব্যয় সাপেক্ষ।  খুব দামি যন্ত্র প্রয়োজন হয়। দক্ষ জনবলও দরকার হয়। এ পদ্ধতিতে পরীক্ষায় রিপোর্ট দিতে ২ থেকে ৫ দিন সময় লাগে।  কিন্তু পিসিআর এর রিপোর্ট ভালো। আক্রান্ত হওয়ার প্রথম দিনেই রোগীকে শনাক্ত করা যায়, কিন্তু রিপোর্ট দিতে দুই থেকে পাঁচ দিন সময় লাগে। আমরা যেটা উদ্ভাবন করেছি এটা হল ‘র‌্যাপিড ডট ব্লট‘। এটা উদ্ভাবন করেছেন ডক্টর বিজয় কুমার শীল এবং তার সঙ্গে তিনজন তরুণ বিজ্ঞানী (আদনান, জমির উদ্দিন, ফিরোজ আহমেদ)। এ পদ্ধতিতে ৫ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে ফলাফল দিয়ে দেওয়া যায়।

ব্রেকিংনিউজ: পরীক্ষার পদ্ধতি সম্পর্কে একটু বলুন।

ডা. জাফরুল্লাহ: অনেকে প্রশ্ন করেন যে, পরীক্ষা করতে এটা প্রয়োগে শরীরের কোনো ক্ষতি হবে কিনা। কিন্তু এটাতো শরীরে কোনোভাবেই প্রয়োগ করা হবে না। এই পদ্ধতিটা হচ্ছে রক্তের গ্রুপ নির্ণয়ের মতো। মানুষের শরীর থেকে এক ফোঁটা রক্ত নিয়ে এর ওপরে দিয়ে ৫ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে বোঝা যাবে যে, রোগী করোনা আক্রান্ত কিনা। তার মানে এটা মানুষের শরীরে প্রয়োগের কোনো বিষয় নয়। আমাদের পদ্ধতি হলো গণস্বাস্থ্য রেপিড ডট,ব্লট' তার মানে হল রক্তের বিন্দু দিয়ে শরীরে কোন রোগ হয়েছে কিনা তা নির্ণয় করা। রেপিট হলো দ্রুত ডট হলো বিন্দু আর ব্লট' হল ব্লাড এত সহজ একটা পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছি। এটা দিয়ে মানুষের রোগ দ্রুত নির্ণয় করা যাবে। হাজারটা টেস্টের দরকার নাই। আমাদেরকে একবিন্দু রক্ত দিলেই বলে দেওয়া যাবে রোগী করোনা আক্রান্ত কী না? 

অন্যদিকে সরকারি যে সিস্টেম আছে। শুধু সরকারি নয় গোটা পৃথিবীতে যে সিস্টেম আছে সেটার নাম হলো পিসিআর। এটি রিপার ট্রান্সকিপ পলিমার টেন ডিরেকশন (আরডিপিসি)। আর সেইটাতে রোগ নির্ণয় করতে তিন থেকে পাঁচ দিন সময় লাগে। এবং ওটার কিটের দাম ১৫০ ডলার এছাড়াও আনুষঙ্গিক খরচ হচ্ছে ১২ থেকে ২৪ শত টাকা। তার মানে এটার একটা পরীক্ষা করতে ১৫ হাজার টাকা খরচ। এটা দিয়ে তো লাখ লাখ পরীক্ষা করা যাবে না। এ কারণে যারি সরকারি কাজে নিয়োজিত আছেন তারা চুপচাপ বসে আছেন। আমাদেরটা খরচ কম হবে যার কারণে সরকারের উচিত আমাদের উদ্ভাবিত ব্যবস্থাকে সাহায্য করা। এখন শুধু দেখতে হবে পয়সার অভাবে যেন আমাদের উদ্ভাবন থেমে না যায়। আমাদের এই পরীক্ষা পদ্ধতি সারা পৃথিবীতে রোগ নির্নয়ে যুগান্তর পরিবর্তন আনবে বলে আমরা আশাবাদী।

ব্রেকিংনিউজ: আপনাদের এমন উদ্যোগের ফলে আপনি সোশ্যাল মিডিয়াসহ বিভিন্ন জায়গায় প্রশংসিত হচ্ছেন এই বিষয়টাকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

জাফরুল্লাহ চৌধুরী: আমাদের জন্য দোয়া করবেন। এটা গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের একটি সামগ্রিক প্রচেষ্টা। আমাদের গবেষক দল বাংলাদেশের। সবচেয়ে বড় কথা হলো বাংলাদেশের লোক এটা আবিষ্কার করেছে। বিজন সেন, নেহাত, জমির, ফিরোজ, ডক্টর মহিবুল্লাহ খান এরা সবাই বাংলাদেশের। এই পাঁচজন একত্রে এ কাজটা করেছেন। আমার নাম জানলেও আসল কাজটা তো ওই পাঁচজন করেছেন। আমি তাদেরকে সার্বিক সহযোগিতা করছি।

ব্রেকিংনিউজ: করোনা আতঙ্কে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কারাগার থেকে আসামিদের মুক্তি দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে করোনা মোকাবিলায় সরকার ও কারা কর্তৃপক্ষের কী করণীয়?

ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী: করোনা ভাইরাস মেকাবিলায় বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে মিল রেখে এই মুহূর্তে ‘যাবজ্জীবন ও ফাঁসির আসামি ছাড়া সবাইকে ছেড়ে দিতে হবে। মোট কথা এখন জেলখানা খালি করতে হবে। প্রয়োজনে প্যারোলে হলেও জামিন দিয়ে কারাগার খালি করতে হবে।

ব্রেকিংনিউজ : সময় দিয়ে কথা বলার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
 
ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী: আপনাকে ও ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি পরিবারকেও ধন্যবাদ।

ব্রেকিংনিউজ/এএইচ/এমএইচ

bnbd-ads