থানায় যারা তদবির ছাড়া আসে তাদের সমস্যা আগে সমাধান

তৌহিদুজ্জামান তন্ময়
১৭ ডিসেম্বর ২০১৯, মঙ্গলবার
প্রকাশিত: ০৯:২৬ আপডেট: ০১:৩৬

থানায় যারা তদবির ছাড়া আসে তাদের সমস্যা আগে সমাধান

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) বিপ্লব বিজয় তালুকদার। গত ২৪ অক্টোবর ডিএমপি হেডকোয়ার্টার্সের এক অফিস আদেশে ডিপ্লোমেটিক সিকিউরিটি বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) বিপ্লব বিজয় তালুকদারকে তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার হিসেবে বদলি করা হয়। সুনামগঞ্জের এই সন্তান ২০০১ সালে পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেন। ২০তম বিসিএস (পুলিশ) ব্যাচের এই মেধাবী কর্মকর্তা মুন্সীগঞ্জ ও নাটোর জেলায় অত্যন্ত দক্ষতা ও সাফল্যের সঙ্গে পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। 

তেজগাঁও বিভাগে যোগ দেয়ার পর থেকেই দীর্ঘদিনের ধরে হাতিরঝিলের নিরাপত্তার ব্যপারে জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ করায় হাতিরঝিলে কিশোর গ্যাং, বাইক রেস, অসামাজিক কার্যকলাপ, চাঁদাবাজি, ডাকাতি, রাতে ছিঁচকে চোরসহ নানাবিধ সমস্যা সমাধান করেছেন। পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশ্যে তার কথা- ‘নিরীহ জনসাধারণকে হয়রানি না করে সততা ও নিষ্ঠার সাথে জনসাধারণকে আইনগত সেবা প্রদান করুন।’ পুলিশে যোগ দেয়ার পর থেকেই বিপ্লব দেশ ও দেশের মানুষের জন্য নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। 

সম্প্রতি দেশের জনপ্রিয় অনলাইন নিউজপোর্টাল ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি-এর মুখোমুখি হন এই পুলিশ কর্মকর্তা। তার সঙ্গে দীর্ঘ আলাপচারিতায় উঠে আসে তেজগাঁও বিভাগের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও ব্যক্তিগত আর কর্মজীবনের নানা অজানা দিক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ব্রেকিংনিউজের স্টাফ করেসপন্ডেন্ট তৌহিদুজ্জামান তন্ময়।

ব্রেকিংনিউজ : পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেয়ার পর নিজের কতটুকু ত্যাগ স্বীকার ও পারিবারিক সাপোর্ট পেয়েছেন?

বিপ্লব : পুলিশের চাকরি করি মানুষের সেবা করার জন্য। যত বড় কষ্টদায়ক হোক আর যত বেদানাদায়ক হোক আমাদের নিয়োগটাই হয়েছে জনস্বার্থে। মানুষের জন্য কাজ করতে ব্যক্তিগত ত্যাগের সম্মুখীন হতে হবেই। আমরা যারা মানুষের জন্য কাজ করি তাদের পরিবারকে সময় দেয়া বড় চ্যালেঞ্জ। আমার সন্তানরা যখন পরীক্ষা শেষ করছে তার বন্ধুরা সবাই মা-বাবাসহ কক্সবাজার বা অন্য কোথাও ঘুরতে যাচ্ছে। অন্যদিকে আমার বাচ্চাটার পরীক্ষার খোঁজ-খবরই নেয়া হচ্ছে না আমার। মানুষকে সেবা দেয়ার মধ্যে যে আনন্দ, অন্যকিছু ত্যাগ করে হলেও সে আনন্দটা তো উপভোগ করি। এটা আমার একটা ভালো লাগার জায়গা। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় পুলিশ সদস্যদের বেতন নির্ধারিত হয়। সেই জনগণ যাতে পুলিশের কাছে সর্বোচ্চ আইনগত সেবা পায় তা নিশ্চিত করাই আমার কাজ।

ব্রেকিংনিউজ : জেলার এসপি থেকে ডিএমপিতে। বিষয়টি কিভাবে দেখছেন?

বিপ্লব : জেলা পর্যায়ের চেয়ে মেট্রো পর্যায়ের চ্যালেঞ্জ অনেক বেশি। এখানকার মানুষ অনেক বেশি সচেতন। মানুষ খুব তাড়াতাড়ি সেবা পেতে চান। যেমন ধরুন- কারো একটা মোবাইল হারিয়ে গেলো, তখন সে চান খুব তাড়াতাড়ি যেন মোবাইলটা উদ্ধার হয়। এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। যদি কারও মোবাইল হারিয়ে যায় তাহলে অবশ্যই থানায় ইনফর্ম (তথ্য) করা প্রয়োজন। কারণ যদি তার হারানো মোবাইলটি কোনও সন্ত্রাসীর হাতে পড়ে তাহলে মোবাইল মালিকের জন্য সেটি হুমকিস্বরূপ। মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি তাদের করণীয় কী -এ বিষয়েও আমরা দিক নির্দেশনা দিয়ে থাকি। তেজগাঁও জোনের মধ্যে কারও একটি মোবাইল চুরি হয়ে গেল তখন আমরা সেই বাসার সিসিটিভি ফুটেজ থেকে ছবি সংগ্রহ করে 'ডিএমপি তেজগাঁও জোন' ফেসবুকে পেজে আপলোড করি। এতে করে যেকোনও এলাকার চোর যদি হাতিরঝিলে এসে চুরি করে তাহলে ফেসবুকে তার ছবি দেওয়ার কারণে কেউ না কেউ তাকে চিনতে পারবে। এতে করে চুরির প্রবণতা কমবে একইসঙ্গে আসামিকেও ধরা সহজ হবে।

ব্রেকিংনিউজ : কোনও না কোনও ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিষয়টি কিভাবে মূল্যায়ন করছেন?

বিপ্লব : পুলিশে যারা চাকরি করে তারাও তো এই সমাজেরই মানুষ। সমাজের বিচ্ছিন্ন কেউ না। দেশের সমাজের যে চিত্র সেটা আমাদের মধ্যেও আছে। আমাদের সবার পারিবারিক মূল্যবোধ, প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যবোধ যদিও এক না। যদি কেউ নীতিহীন কাজ করে থাকে তাহলে তা তার ব্যক্তিগত দায়। সেটা কখনো পুলিশ বাহিনীর দায় নয়। বাংলাদেশ পুলিশ গর্ব করেই বলতে পারে- নীতিহীন কাজের সঙ্গে যারা জড়িত তা যদি প্রমাণিত হয় তাদের শাস্তির আওতায় আনা হয়।


ব্রেকিংনিউজ : তেজগাঁও বিভাগে আগের চেয়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক নাকি উন্নতি হয়েছে?

বিপ্লব : শুধু তেজগাঁও বিভাগে নয়, দেশের সব এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের চেয়ে অনেক ভালো। সেটার অনেক কারণ আছে, সামাজিক, রাজনৈতিক, তবে আমার এলাকায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি কেমন রয়েছে তা নাগরিকেরা ভালো বলতে পারবে। তারা মূল্যায়ন করবে। আমাদের কাজ আমরা করে যাচ্ছি।

ব্রেকিংনিউজ : দীর্ঘদিন ধরে হাতিরঝিলের নিরাপত্তার কি উন্নতি হয়েছে?

বিপ্লব : নানা রঙের আলোর ঝলকানিতে দর্শনার্থীদের কাছে টানে হাতিরঝিলের দৃষ্টিনন্দন নির্মাণশৈলী। কিন্তু রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হরেক বর্ণের আলোকচ্ছটাও মিইয়ে যেতে থাকে। পুলিশের চেকপোস্ট, অপরাধীদের চিহ্নিত করা, অপরাধীদের গ্রেফতার করা, নিরাপত্তা জোরদার, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণসহ বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়ার পর হাতিরঝিলের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিত আগের চেয়ে এখন অনেক ভালো। হাতিরঝিলে রাত-বিরাতে ঘুরতে আসা মানুষ নিরাপদে সৌন্দর্য উপভোগ করছে।

ব্রেকিংনিউজ : জনবান্ধব পুলিশ হিসেবে কি কি ভূমিকা পালন করছেন?

বিপ্লব : পুলিশ কখনোই জনগণের দূরে থেকে কাজ করতে পারে না। পুলিশ সবসময় জনসম্পৃক্ত। মানুষ না জেনে অনেক সময় অপরাধ করে থাকেন, এ জন্য মানুষকে সচেতনতার কাজটি আগের তুলনায় এখন বাড়িয়ে দিয়েছি। মাদক, সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদ প্রতিহত করার মাধ্যমে দেশের যুবসমাজের সঙ্গে সভা-সেমিনার করা হচ্ছে। কেউ যদি রাস্তা পারাপার হতে যায় আমাদের দেশের মানুষ তখন শর্টকাট উপায় খুঁজে রাস্তার মাঝখান থেকে দৌড় দেয়। ঝুঁকি নিয়ে যাতে পথচারীরা রাস্তা পার না হয় সেদিকে সচেতন করা হচ্ছে। যেহেতু জনবহুল দেশ সেহেতু জনগণকে সচেতন করে কিভাবে অপরাধ থেকে মুক্ত রাখা যায় সেজন্য পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে।

ব্রেকিংনিউজ : তেজগাঁও জোনের ওসিদের উদ্দেশ্যে আপনার ম্যাসেজ কি?

বিপ্লব : শুধুমাত্র থানার ওসিদের ক্ষেত্রে না তেজগাঁও জোনের সংশ্লিষ্ট সকল পুলিশদের আমার নির্দেশনা আছে, 'মানুষ যেন সেবা নিতে এসে হয়রানির স্বীকার না হয়।' এছাড়াও যারা উচ্চ পর্যায়ের তদবীর নিয়ে থানায় আসে, তাদের চেয়ে যাদের কোনো তদবীর নেই তাদের সমস্যা আগে সমাধান করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

ব্রেকিংনিউজ : সময় দেয়ার জন্য ধন্যবাদ আপনাকে।
 
বিপ্লব : আপনাকে ও ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি পরিবারকেও ধন্যবাদ।

ব্রেকিংনিউজ/টিটি/এমআর

bnbd-ads