বন্যা কমতেই মানুষ ও গবাদিপশুর মাঝে ছড়িয়ে পড়ছে রোগব্যাধী

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
১০ আগস্ট ২০২০, সোমবার
প্রকাশিত: ১১:১৫

বন্যা কমতেই মানুষ ও গবাদিপশুর মাঝে ছড়িয়ে পড়ছে রোগব্যাধী

রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলায় বন্যার ধকল কাটতে না কাটতেই ছড়িয়ে পড়েছে পানিবাহিত বিভিন্ন রোগব্যাধী। এতে মানুষের পাশাপাশি আক্রান্ত হচ্ছে গবাদি পশুও। সাম্প্রতিক বন্যার ক্ষয়ক্ষতি এখনও কাটিয়ে উঠতে পারে নাই বানভাসিরা। এরই মধ্যে রোগব্যাধী নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছে তারা। ‘এ যেন মরার উপর খারার ঘা’। কিন্তু নেই চিকিৎসা সেবা সহায়তা। এসব মানুষের হাতে কাজ নেই। হাতে নেই টাকা পয়সা। ফলে ঘরবাড়ি মেরামত করা, ভেঙে পড়া নলকুপ ও লেট্রিন সংস্কার নিয়ে পড়েছে বিপাকে। তাদের সরকারিভাবে সহযোগিতা করা হলেও তা ছিল চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। ফলে এখনও এসব মানুষেরা ভুগছে নিজেদের খাদ্য সংকটের পাশাপাশি গবাদিপশু খাদ্য সংকটে।

সূত্রে জানা গেছে, চলতি বন্যায় রংপুরের গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া, হারাগাছ, পীরগাছা, পীরগঞ্জ, লালমনিরহাট সদর, তিস্তা, হাতিবান্ধা, কালীগঞ্জ, আদিতমারি, দহগ্রাম, নীলফামারীর জলঢাকা, ডিমলা, কিশোরগঞ্জ, গাইবান্ধা সদর, সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা, ফুলছড়ি, গোবিন্দগঞ্জ এবং কুড়িগ্রাম জেলার সদর, রাজারহাট, চিলমারি, রাজিবপুর, উলিপুর, নাগেশ্বরী,ফুলবাড়ি, রৌমারিসহ এ অঞ্চলের ৫ জেলার প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ নদী ভাঙ্গন, পানিবন্দি শিকার হয়েছেন। বহু ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। অনেকেই সব কিছু হারিয়ে পথে বসেছে। এরই মধ্যে পানিতে ডুবে প্রায় ২৫ জনের মৃত্যুও হয়েছে। তবে সব চেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে রংপুরের গঙ্গাচড়া, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলার মানুষ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রংপুর অঞ্চলে বন্যার পানি বিপদসীমার উপর থেকে কমতে শুরু করার পর থেকে দেখা দিয়েছে পানিবাহিত রোগের প্রকোপ। চরাঞ্চলের মানুষদের হাত, পা ও আঙ্ধসঢ়;গুল ফেঁটে যাচ্ছে। শরীরে বাসা বাঁধছে নানান জটিল রোগ। স্বাস্থ্যবিভাগ বন্যাকালিন সময়ে মেডিকেল টিম গঠনের কথা বললেও দুর্গম চরাঞ্চলে চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হাজার হাজার চরাঞ্চলবাসী।

কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের ৯ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সিদ্দিক আলী জানান, আমার ওয়ার্ডের মশালের চর গ্রামটি নদী বেষ্টিত। এখানে প্রায় তিন শত পরিবার রয়েছে। প্রায় প্রত্যেক বাড়িতে গরু-ছাগলের রোগ দেখা দিয়েছে। গরু লাম্পি স্কিন ডিজিজ দেখা দিয়েছে। এছাড়াও বাড়ির পুরুষ ও মহিলার হাত ও পায়ের চর্মরোগে এবং শিশুরা সর্দি, কাশি ও পাতলা পায়খানায় আক্রান্ত হয়েছেন।

পার্শ্ববর্তী ৭নং ওয়ার্ডের মেম্বার আবু বক্কর খান জানান, আমার বতুয়াতুলি ও ফকিরেরচর গ্রামে ১৯৭টি পরিবারের মধ্যে প্রায় অর্ধেক পরিবারে গরুর রোগ দেখা দিয়েছে। এছাড়াও দেখা দিয়েছে নারী-পুরুষের চর্ম রোগ। প্রতিটি গরুর চিকিৎসা বাবদ আড়াই হাজার টাকা থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হচ্ছে। এতে কর্মহীন মানুষ দিশেহারা হয়ে পরেছে। এছাড়াও চরগুলোতে ডাক্তার না থাকায় নৌকাভাড়া করে বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে রোগীদের চিকিৎসা করতে অনেক ব্যয় হচ্ছে। এতে হাঁফিয়ে উঠছে চরের মানুষ।

এদিকে চিলমারি আষ্টমীর চর গ্রামের আলম মিয়া ও রাজিবপুরের বাইটকামারীর রিপন মিয়া জানান, আমাদের চরাঞ্চলে সরকারি কোন পশু ডাক্তার আসে না। আমাদের বাড়তি ব্যয়ে নৌকা ভাড়া করে উপজেলা সদরে গিয়ে চিকিৎসা করাতে হয়।

লালমনিরহাটের মহিষখোচার আমিনুল হক, রেজাউল করিমসহ বেশ কয়েকজন জানান, চরের সম্পদ হল গরু। এই গরু না থাকলে আমরা বাঁচবো কিভাবে।

চরাঞ্চলের মানুষরা দাবি করেন, আমাদের দুর্দশার কথা চিন্তা করে সরকার যদি সপ্তাহে একবার করে চরগুলোতে ডাক্তার পাঠানোর ব্যবস্থা করে তাহলে চরের মানুষ সঠিক চিকিৎসা সেবা পাবে। নাহলে আমাদেরকে প্রতারণা করে অর্থ বাগিয়ে নিচ্ছে এলাকার পল্লী চিকিৎসকরা।

কুড়িগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. হাবিবুর রহমান জানান, আমাদের আশংকা রয়েছে যে বন্যা পরবর্তীতে পানি নেমে যাওয়ার পর পানিবাহিত রোগগুলো বিস্তার লাভ করতে পারে। এজন্য আমাদের ৮৫টি মেডিকেল টিম প্রস্তুত রয়েছে।

এ ব্যাপারে কুড়িগ্রামের অতিরিক্ত প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা: মকবুল হোসেন জানান, লাম্পি স্কিন ডিজিজ মূলত ভাইরাল ডিজিজ। মশামাছি থেকে এটি ছড়িয়ে পরে। এতে গরু মারা যাওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে চিকিৎসায় অবহেলা করলে মারাও যেতে পারে। এখনো যে সমস্ত চর এলাকায় আমাদের লোকজন যেতে পারে নাই। দ্রুত সেখানে ভ্যাকসিন নিয়ন্ত্রণ ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে।

রংপুরের সিভিল সার্জন ডা. হিরম্ব কুমার রায় বলেন, এখন পর্যন্ত ডায়েরিয়া ও নিউমেনিয়াসহ অন্যান্য রোগের সেভাবে প্রার্দুভাব দেখা যায়নি। আমাদের মেডিকলে টিম প্রস্তুত রয়েছে।

ব্রেকিংনিউজ/এমজি

bnbd-ads