আরও একবার বুক চিতিয়ে লড়াই করলো সুন্দরবন

নিউজ ডেস্ক
২১ মে ২০২০, বৃহস্পতিবার
প্রকাশিত: ০২:১২ আপডেট: ০২:৫৫

আরও একবার বুক চিতিয়ে লড়াই করলো সুন্দরবন

সুন্দরবন যে বাংলাদেশের ‘প্রাকৃতিক ঢাল’ সেটি নতুন করে প্রমাণের কিছু না থাকলেও আবারও প্রমাণিত হলো। সিডর, আইলা, বুলবুলের মতো মহাশক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতের মুখে বাংলাদেশের সুরক্ষায় প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিল সুন্দরবন। এবার আরও একবার সুপার সাইক্লোন ঘূর্ণিঝড় আম্পানের বিরুদ্ধে বুত চিতিয়ে লড়াই করে দেশকে বিধ্বংসের হাত থেকে বাঁচালো বিশ্বের সর্ববৃহৎ এই ম্যানগ্রোভ বন। সেই বনভূমির নোনা-সহিষ্ণু একেকটা বৃক্ষ যেন এক একটা বর্ম হয়ে দাঁড়িয়েছিল আম্পানের সামনে। বাংলাদেশ অংশের প্রায় ৬০০০ কিলোমিটারের এই শ্বাসমূলীয় বন আবারও জানান দিলো, প্রকৃতির যেকোনও আঘাত প্রতিহত করে দেশকে সুরক্ষা দিতে তার মতো বিশ্বস্ত হাতিয়ার আর কেউ নেই। 

এক সপ্তাহেরও বেশি সময় দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন দক্ষিণ আন্দামান সাগরে সৃষ্ট লঘুচাপটি ঘনীভূত হয়ে দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন দক্ষিণ আন্দামান সাগর এলাকায় নিম্নচাপ, এরপর গভীর নিম্নচাপে রূপ নিয়ে এক পর্যায়ে গত মঙ্গলবার ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়। এরপরই বঙ্গোপসাগরের কেন্দ্রস্থল থেকে উত্তর ও উত্তর-পূর্ব উপকূলের দিকে ধেয়ে আসতে শুরু করে। 

এরইমধ্যে গত কয়েকদিনে বিশেষত শেষ দু-তিন দিন ধরে ঘূর্ণিঝড়টির সম্ভাব্য শক্তির কথা মাথায় রেখে সব ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল সরকারের সংশ্লিষ্ট ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়, বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা, রেডক্রিসেন্ট সোসাইটি, স্বেচ্ছাসেবকরা। গতকাল বুধবার দুপুর পর্যন্ত উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ২৫ লাখ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে আনা হয়েছিল। চলমান করোনা সংক্রমণের মধ্যেও এসব মানুষকে সাধ্যমত সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে সার্বক্ষণিক উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছিল। দেয়া হচ্ছিল সার্বিক সেবাও। 

গতকাল বুধবার সকাল থেকে আরও প্রচণ্ড শক্তি নিয়ে প্রবল বেগে উপকূলের দিকে ধেয়ে আসতে শুরু করে সুপার সাইক্লোন আম্পান। দেশের সংবাদমাধ্যমগুলোতে ঘূর্ণিঝড়ের সার্বক্ষণিক আপটেড খবর প্রচার হতে থাকে। সকাল থেকেই দেশের সকল সমুদ্রবন্দর ও উপকূলীয় জেলা এবং জেলাগুলোর অদূরবর্তী চরাঞ্চলে মহাবিপদ সংকেত জারি করা হয়।

দুপুরের পরই ঘূর্ণিঝড়টি আঘাত হানে পশ্চিমবঙ্গে। সেখানে ব্যাপক তাণ্ডব চালায়। বেশ কিছু মানুষ হতাহত হওয়া ছাড়াও বাড়িঘর, গাছপালা, বন-বনাঞ্চলে আঘাত হানে। 

বিকেল ৫টার পর আম্পানের অভিমুখ হয় বাংলাদেশ। শুরুতে ঘূর্ণিঝড় আম্পান বাংলাদেশে প্রবেশ করে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার সর্বদক্ষিণের লোকালয় মুন্সীগঞ্জ-সংলগ্ন সুন্দরবন দিয়ে। যেখান থেকে কিছুটা দক্ষিণে এগোলেই সুন্দরবনের ভারতীয় অংশ শুরু। সাতক্ষীরায় ব্যাপক তাণ্ডব চালানোর পর সেটি দেশের অন্যান্য উপকূলীয় এলাকায় কমবেশি আঘাত হেনে যশোর হেনে যশোর-পাবনা হয়ে শেষ রাতের দিকে রাজশাহীতে গিয়ে ক্ষমতা হারাতে থাকে। জামালপুর-ময়মনসিংহ হয়ে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে গিয়ে ঘূর্ণিঝড়টি বিলীন হওয়ার পূর্বাভাস থাকলেও বৃহস্পতিবার দুপুর নাগাদ সেটি পথ পরিবর্তন করে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল বরাবর অগ্রসর হচ্ছে। বর্তমানে আম্পানের কেন্দ্রস্থল চাঁপাইনবাবগঞ্জে রয়েছে। 
   
পেছনের কথায় ফিরে গিয়ে বলতে হয়, সুন্দরবন কতবার যে ঘূর্ণিঝড়, ঝড়, প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করেছে, তার কোনও পরিসংখ্যান নেই। বৃক্ষের মজবুত বেষ্টনি আর অসংখ্য নদী-নালা যুগ যুগ ধরে প্রাণী ও সম্পদকে রক্ষা করে আসছে। নিজে ক্ষত-বিক্ষত হলেও উপকূলের কখনো ক্ষতি হতে দেয় না সুন্দরবন।

গতকাল বিকেলেও যখন আম্পান অতি প্রবল শক্তি নিয়ে বাংলাদেশের উপকূলে আছড়ে পড়ার ভয় দেখাচ্ছিল তখনও এই সুন্দরবন সর্বাগ্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুন্দরবনের সামনে এসেই প্রথম দফায় নতি স্বীকার করেছে সুপার সাইক্লোন। প্রকৃতপক্ষে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ব্যূহটি ভেদ করার পরই ক্লান্ত হয়ে পড়ে ঘূর্ণিঝড়টি। 

এ বিষয়ে সুন্দরবন একাডেমির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, ‘আসলে নতুন করে বলার কিছু নেই। যেকোনও প্রাকৃতিক দুর্যোগে দেশকে রক্ষায় বীরের মতোই বুত পেতে দেয় সুন্দরবন। নিজে আঘাত সহ্য করে, কিন্তু দেশকে লণ্ডভণ্ড হতে দেয় না। এবারও আম্পানের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বুক চিতিয়েই লড়াই করলো সুন্দরবন।’

ব্রেকিংনিউজ/এমআর

bnbd-ads