ঝাজ বাড়ছে পেঁয়াজে, দামে স্বস্তি কবে?

আহসান হাবিব সবুজ
১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, শুক্রবার
প্রকাশিত: ১০:৩৫ আপডেট: ০২:২৪

ঝাজ বাড়ছে পেঁয়াজে, দামে স্বস্তি কবে?
ছবি: সালেকুজ্জামান রাজীব

কোনও ধরনের পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই গেল ১৪ সেপ্টেম্বর হঠাৎ করে বাংলাদেশে পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ ঘোষণা করে ভারত। এর পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৪০-৪৫ টাকা কেজির পেঁয়াজের দাম একলাফে ১০০ টাকা ছাড়িয়ে যায়। গত দু-তিন দিন ধরে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন পাইকারি ও খুচরো বাজারে ইচ্ছেমতো চড়া দাম হাঁকাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। কোথাও কোথাও ১১০-১২০ টাকা কেজি দরেও পেঁয়াজ বিক্রি হতে দেখা যাচ্ছে। তার ওপর পর্যাপ্ত মজুদ থাকা সত্ত্বেও বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পেঁয়াজের ঝাজ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছেন একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী ও আড়তদাররা। 

ক্রমাগত বাড়তে থাকা পেঁয়াজের দামে লাগাম পড়বে কবে কিংবা আদৌ দাম কমবে কিনা- এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, বিদেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি করতে না পারলে দাম কমা তো দূরে, উল্টো আরও বাড়তে পারে। তারা ভারতের বিকল্প হিসেবে পেঁয়াজ রফতানিকারক অন্যান্য দেশগুলো থেকে পেঁয়াজ আদমানির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। 

বৃহস্পতিবার (১৬ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে এ প্রতিবেদন তৈরি করেছেন ব্রেকিংনিউজের স্টাফ করেসপন্ডেন্ট আহসান হাবীব সবুজ।

ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, গত বছরও ঠিক এ সময়টাতেই দেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম হু হু করে বেড়ে গিয়েছিল। এ বছরও একই অবস্থা হচ্ছে। খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে অন্য দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি করতে না পারলে ব্যাপক হারে দাম বেড়ে যাবে।

রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর পেঁয়াজের আরতের কয়েকজন বিক্রেতা জানিয়েছেন, দিন যত যাবে পেঁয়াজের দাম আস্তে আস্তে তত বাড়তে থাকবে। কারণ আমাদের এখন আগের চেয়ে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। তাই বিক্রিও করতে হচ্ছে বেশি দামে।

সেখানকার পেঁয়াজ ব্যবসায়ী শাহারুল ইসলাম ব্রেকিংনিউজকে বলেন, ‘ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি করতে না পারলে গত বছরের মতোই পেঁয়াজের দাম কেজিতে কয়েকগুণ বেড়ে যাবে।’

ভারত হঠাৎ করে পেঁয়াজ রফতানি কেন বন্ধ করলো- এ সম্পর্কে অভিমত জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দেশে যে পেঁয়াজ উৎপন্ন হয় সেটা দেশের যথেষ্ট নয়। আর সিংহভাগ পেঁয়াজ ভারত থেকেই আমদানি করা হয়। এখন যদি তা বন্ধ করে দেয়া হয় তাহলেতো পেঁয়াজের দাম বাড়বে। ভারত হয়তো তাদের বাণিজ্য কৌশল হিসেবেই রফতানি বন্ধ করেছে।’

গোডাউনে পর্যাপ্ত মজুদ রেখেও পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে দেয়া হয় কিনা- জানতে চাইলে অপর এক ব্যবসায়ী হাসিবুল ইসলাম ব্রেকিংনিউজকে বলেন, ‘পেঁয়াজের চাহিদা ৬০ শতাংশ মেটানো হয় দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজ থেকে। বাকি ৪০ শতাংশ আমদানিকৃত পেঁয়াজে। আর ভারত থেকেই বেশিরভাগ পেঁয়াজ আমদানি করা হয়। সেক্ষেত্রে আমার মনে হয় না কেউ স্টক করে রাখে। তবে হ্যাঁ, কিছু কিছু অসাধু ব্যবসায়ী আছে তারা স্টক করে রাখতে পারে। তবে পেঁয়াজের দাম বাড়ার কারণ হিসেবে আমদানি বন্ধ করাটাই উল্লেখযোগ্য।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে পেঁয়াজের বাজার অনেকটাই ভারতের ওপর নির্ভরশীল। এ মুহূর্তে ভারত আমাদের পেঁয়াজ দিচ্ছে না। যে কারণেই পেঁয়াজের দাম বেড়েছে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক আমদানিকারক জানিয়েছেন, ‘যারা ভারতকেন্দ্রিক আমদানি করেন। তারা অন্য কোনও জায়গা থেকে পেঁয়াজ আনার ঝুঁকি নিতে চাচ্ছে না। অন্য জায়গা থেকে পেঁয়াজ আনলে পেঁয়াজের দাম বাড়তো না।’

কারওয়ান বাজার পেঁয়াজ আড়তদার জুয়েল বিশ্বাস ব্রেকিংনিউজকে জানান, হঠাৎ করে পেঁয়াজের দাম বেড়ে যাওয়ায় কিছু অসাধু আড়তদার পেঁয়াজ স্টক করা শুরু করেছে। তবে তারা স্টক করলেও পেঁয়াজের দাম বাড়ার সম্ভাবনা আর নেই। ভারত থেকে পেঁয়াজ আসতে শুরু করেছে। আশা করছি আগামী সপ্তাহ থেকে নাহলেও পরের সপ্তাহ থেকে পেঁয়াজের দাম কেজিতে ৩০/৩৫ টাকা কমে আসবে।

কারওয়ান বাজারের বিক্রেতা আশরাফ আলী বলেন, একদিনের ব্যবধানে কেজিতে পাঁচ টাকা কমেছে আজ। এলসির পেঁয়াজ এসেছে দেখেই দাম কমেছে, বাজারে পর্যাপ্ত এলে দাম আরও কমবে।

কারওয়ান বাজারের পেঁয়াজ ব্যবসায়ী কামাল হোসেন ব্রেকিংনিউজকে বলেন, ‘পেঁয়াজের দাম নতুন করে আরও বাড়ার সম্ভাবনা কম। কারণ পেঁয়াজের বিক্রি অনেক কমে গেছে। আতঙ্কে দুদিনে সাধারণ মানুষ অনেক পেঁয়াজ কিনেছেন। আজ বিক্রি নেই বললেই চলে।’

তিনি বলেন, ‘এবার পেঁয়াজের দাম অস্বাভাবিক বাড়ার সম্ভাবনা যেমন কম, তেমনি দাম কমার সম্ভাবনাও কম। গতকাল (বুধবার) আমরা দেশি পেঁয়াজ ৮০ টাকা কেজি বিক্রি করেছি। আজও ৮০ টাকা কেজি বিক্রি করছি। নতুন পেঁয়াজ না ওঠা পর্যন্ত পেঁয়াজের এই দাম স্থির থাকবে বলে মনে হচ্ছে। আমাদের ধারণা, পেঁয়াজের দাম খুব বেশি ওঠা-নামা করবে না। হয়তো কেজিতে ৫-১০ টাকা কম-বেশি হতে পারে।’

কারওয়ান বাজারের আরেক ব্যবসায়ী গৌতম বাবু বলেন, ‘কারওয়ান বাজার ও শ্যামবাজারে আজ দেশি পেঁয়াজের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা। আমদানি করা ভারতের পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা। আজ নতুন করে পেঁয়াজের দাম বাড়া বা কমা কোনোটিই হয়নি। পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, পেঁয়াজের এই দাম কয়েক দিন স্থির হবে।’

রাজধানীর এক ক্ষুদ্র আরত ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি পেঁয়াজ সম্পর্কে কোনও কথা বলতে চান নাই। তবে নাম না দেয়ার শর্তে তিনি বলেন, ‘ইচ্ছে করে বাজারে কম পেঁয়াজ ছাড়া হচ্ছে।’

তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘কিছু বিগ ব্যক্তিকে বিশেষ পেঁয়াজ আমদানি করতে দেয়া হয়েছে। তাদের লাভ না হওয়া পর্যন্ত বাজারে পেঁয়াজ ছাড়বে না। এক ধরনের সিন্ডিকেট তৈরি করে রেখেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘শুধু ভারতের জন্যই বসে থাকতে হবে কেন? অন্য দেশ থেকে আমদানি করার ব্যবস্থা করলে তো পেঁয়াজের দাম বাড়ে না। গত বছর এ সময়ে পেঁয়াজের দাম বাড়া শুরু করেছিল। তাহলে এবছর আরও আগে থেকে কেন ব্যবস্থা নেয়া হলো না?’

ব্রেকিংনিউজ/এএইচএস/এমআর

bnbd-ads