বড় বা‌জেটেও ব্যয় বাড়ছে না, প্রাক্কলন ও প্রকৃত ব্যয়ে বৈপরীত্য

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
৪ জুন ২০২০, বৃহস্পতিবার
প্রকাশিত: ০৮:১৪ আপডেট: ১১:১৫

বড় বা‌জেটেও ব্যয় বাড়ছে না, প্রাক্কলন ও প্রকৃত ব্যয়ে বৈপরীত্য

প্রতিবছর জাতীয় বাজেটের আকার বাড়লেও বাস্তবায়নে ব্যয় বাড়ছে না বরং ক্রমান্বয়ে কমছে। প্রতিবছর বরাদ্দ বাড়লেও আগের চেয়ে অনুপাতিক হারে ব্যয় কম হচ্ছে। ফলে বাজেটের প্রাক্কলন এবং প্রকৃত ব্যয়ের পার্থক্য ক্রমশ বাড়ছে। তাই বড় বাজেট ঘোষণা করে সরকার বাহবা পেলেও এর বাস্তবায়ন না হওয়ায় সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। চলতি বছরের বাজেট বাস্তবায়নেও হতাশাজনক চিত্র দেখা যাচ্ছে। 

গত ১০ বছর ধরে প্রতিবছরই বাজেট বাস্তবায়নের হার কমেছে। চলতি অর্থবছরেও গত বছরের তুলনায় বাজেট বাস্তবায়নের হার কমেছে। ২০১০-১১ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নের হার ৯৭ শতাংশ হলেও বর্তমানে তা কমে এসেছে ৭০ শতাংশের নিচে।

তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বছরের শুরুতে ঘটা করে আকার বাড়িয়ে চাহিদা সৃষ্টির যে কথা বলা হয়, বছর শেষে তা গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে। আবার শেষ দিকে এসে বাজেট সংশোধন করা হয়। সেই সংশোধিত বাজেট বাস্তবায়ন করাও সম্ভব হয় না।

চলতি অর্থবছরের প্রথম দশ মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে ৪৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। টাকার অংকে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৯৮ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা। এরমধ্যে এপ্রিলে ব্যয় হয়েছে ৮ হাজার ১৩৬ কোটি টাকা। অন্যদিকে গত অর্থবছরের প্রথম দশ মাসে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ৫৪ দশমিক ৯৪ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাজেটের আকারের চেয়েও প্রকৃত ব্যয় গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রকৃত খরচে অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে।

তাদের মতে, বড় বাজেট দিলেই হবে না। দেখতে হবে, আমাদের অর্থনীতির ধারণ করার মত ক্ষমতা আছে কিনা। তা না হলে বাজেটের কাঙ্ক্ষিত সুফল সাধারণ জনগণ পাবে না।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, চাহিদার নিরিখে বাজেট দেয়া হলে বাস্তবায়ন গুরুত্ব থাকতে হবে। ব্যয়ের সক্ষমতা অর্জনে কেন পিছিয়ে থাকা- সেই প্রশ্নটির উত্তর খোঁজা দরকার এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। কারণ অর্থবছরের শুরুতে যতটা না প্রত্যাশার কথা বলা হয় বাস্তবায়ন না হওয়ায় জনগণের কাছে বিষয়টি গ্রহণযোগ্য হচ্ছে না। চলতি অর্থবছরেও একই অবস্থা হবে। কারণ, করোনার বিশ্বমন্দাসহ নানা কারণে এবারে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বাজেট বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণ হিসেবে বিভিন্ন সময়ে দক্ষতা ও সমন্বয়হীনতার অভাবকে দায়ী করা হলেও বিগত কয়েক বছর ধরে এ দুটো খাতে বেশ কাজ হয়েছে। তার পরেও বাস্তবায়ন হয়নি শতভাগ। কোন উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থ ব্যয় করতে না পারলে অন্য প্রকল্পে টাকা স্থানান্তরের নিয়ম করা হলেও বছর শেষে এ কাজেও ততটা সুফল মেলে না বরং বছরের শেষ দিকে এসে টাকা ফেরত দিতে অনীহা কোন কোন মন্ত্রণালয়ের ও বিভাগের।

গত এক দশকে ২০১০-১১ অর্থবছরের বাজেটের বাস্তবায়ন তুলনামূলক বেড়েছে। কিন্তু শতভাগ হয়নি।সরকারি হিসেবে গত ১০ বছরের সংশোধিত বাজেট বাস্তবায়নের হার গড়ে ৭০ শতাংশের কম হয়েছে যদিও এর গুণগত ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

এই বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম ব্রেকিংনিউজকে বলেন, ‘বাজেট ঘোষণার সময় ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়, বছর শেষে তার চেয়ে অনেক কম খরচ হয়। প্রতিবছরই এ প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। সম্প্রতি বরাদ্দের চেয়ে প্রকৃত ব্যয়ের পার্থক্য বেশি হচ্ছে। ফলে বাজেট এখন ‘কাগুজে’ পরিণত হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘বাস্তবায়নযোগ্য বাজেট দেয়ার কথা বলা হলেও কখনোই আমলে নিচ্ছে না সরকার।’ বড় বাজেটের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘এতে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়া যায়। কিন্তু লক্ষ্য পূরণ না হলে বাজেটের কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলবে না।’

গত ১০ বছরের বাজেট বাস্তবায়নের পরিসংখ্যানে দেখা যায়,২০১০-১১ অর্থবছরে ১ লাখ ৩২ হাজার ১৭০ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়। অর্থবছর শেষে বাজেট বাস্তবায়ন হয়েছে ৯৭ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। বাজেটে খরচের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকা। ২০১১/১২ অর্থবছরের বাজেটের আকার ছিল ১ লাখ ৬৩ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা। অর্থবছর শেষে ব্যয় করা  অর্থের পরিমাণ ১ লাখ ৫২ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকা। বাস্তবায়নের হার ৯৩ দশমিক ১৮ শতাংশ।

২০১২-১৩ অর্থবছরে বাজেটের আকার ছিল ১ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা। অর্থবছর শেষে ব্যয় হয় ১ লাখ ৭৪ হাজার কোটি টাকা। ২০১২-১৩ অর্থবছরে বাজেট বাস্তবায়নের হার ৯০ দশমিক ৭৬ শতাংশ। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো বাজেটের আকার ২ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে ২ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা হয়। বছর শেষে মোট বাজেটের মধ্যে ব্যয় হয় ১ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। বাজেট বাস্তবায়নের হার ৮৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ।

২০১৪-১৫ অর্থবছরে বাজেট ঘোষণা করা হয় ২ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা। বাস্তবায়ন করা হয় ২ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। অর্থবছর শেষে বাজেট বাস্তবায়নের হার ৮১ দশমিক ৫৯ শতাংশ। আর ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ২ লাখ ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়। পরে তা কমিয়ে ২ লাখ ৬৪ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা নির্ধারণ করলেও শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়েছে ২ লাখ ৩১ হাজার ৬৫৩ কোটি টাকা। বাজেট বাস্তবায়নের হার ৭৮ দশমিক ৫০ শতাংশ।

অন্যদিকে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাজেট আকার ছিল ৩ লাখ ৪০ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা। বছর শেষে বাজেট বাস্তবায়ন হয়েছে ৭৬ শতাংশ। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট আকার ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে ২৮ হাজার ৭৭১ কোটি টাকা কাটছাঁট করা হয়। বছর শেষে বাজেট বাস্তবায়নের হার দাঁড়ায় ৭০ শতাংশের কিছু বেশি। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাজেটের আকার ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। সংশোধিত বাজেটে এর আকার দাঁড়ায় ৪ লাখ ৪২ হাজার ৫৪১ কোটি টাকা। বাস্তবায়নের হার ৭০ শতাংশের কম।

চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার বাজেট পেশ করা হয়েছিল গত ১৩ জুন ২০১৯ তারিখে। ২১ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা কমিয়ে সংশোধিত বাজেট ঠিক করা হলেও করোনার প্রভাবে বাস্তবায়ন কম হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।

ব্রেকিংনিউজ/এএইচএস/এমআর

bnbd-ads