বাজে অবস্থায় পড়তে যাচ্ছে জাপানের অর্থনীতি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১৯ মে ২০২০, মঙ্গলবার
প্রকাশিত: ০২:৪১ আপডেট: ০৪:৩৫

বাজে অবস্থায় পড়তে যাচ্ছে জাপানের অর্থনীতি

করোনা ভাইরাসের নেতিবাচক প্রভাবে ফ্রান্স ও জার্মানির পর অর্থনৈতিক মন্দার মুখে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির  দেশ জাপান। ২০১৫ সালের পর ফের মন্দায় পতিত হলো দেশটির অর্থনীতি। গত বছরের শেষ প্রান্তিকের তুলনায় জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে দেশটির অর্থনীতি সংকুচিত হয়েছে ৩.৪ শতাংশ হারে। এ নিয়ে টানা দুই প্রান্তিকে সংকুচিত হলো বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, করোনার ভয়াবহতা বাড়লে জাপানের অর্থনৈতিক মন্দা আরো ঘনীভূত হবে। খবর ব্লুমবার্গ।

করোনার গণ সংক্রমণ ঠেকাতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়ে বিশেষ নজর দিয়েছে জাপান। এতে দেশটিতে ভোক্তাব্যয় অনেকখানি কমে গেছে। এছাড়া বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়ায় জাপানের রফতানিতেও ব্যাপক ধস নেমেছে। এসব কারণে মন্দা ভাব তৈরি হয়েছে দেশটির অর্থনীতিতে। 

করোনার প্রকোপ থেকে বাঁচতে দেশে দেশে চলছে লকডাউন। এতে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়ায় অচল হয়ে পড়ে অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্যও। এতে গোটা বিশ্বই দুমড়ে মুচড়ে গিয়েছে। এ ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট মহামারীতে বিশ্ব প্রায় ৮.৮ ট্রিলিয়ন ডলার ক্ষতির মুখোমুখি হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। গত সপ্তাহে অর্থনৈতিক মন্দায় পড়ে ইউরোপের অন্যতম অর্থনীতির দেশ জার্মানি। এবার তাদের পথে জাপানও।

জাপান সেই অর্থে লকডাউন ঘোষণা না করলেও জরুরি অবস্থা চালু ছিল। ফলে রফতানি বাণিজ্য নির্ভর দেশটির সরবরাহ চেইন ও ব্যবসায় মারাত্মক প্রভাব পড়ে। এতেই প্রথম তিন মাসে জাপানের জিডিপি ৩.৪ শতাংশ কমে যায়। গত বছরের শেষ তিন মাসে তাদের জিডিপি পড়ে গিয়েছিল ৬.৪ শতাংশ। এবার করোনা ভাইরাসের কারণে তা আরেকবার কমলো।

জাপানের জিডিপি সংকোচনের এ হার বিশ্লেষকদের পূর্বাভাসের চেয়ে কিছুটা কম। এর আগে ধারণা করা হয়েছিল, প্রথম প্রান্তিকে দেশটির অর্থনীতি ৪.৫ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে। পূর্বাভাসের চেয়ে কম সংকোচনের কারণ হলো, করোনার প্রকোপ শুরুর আগে জাপানে ভোক্তা ও ব্যবসা খাতে ব্যয় প্রত্যাশার চেয়ে বেশি ছিল। তবে বিশ্লেষক ও নীতিনির্ধারকরা সতর্ক করে বলেছেন, চলতি প্রান্তিকে খারাপ কিছু দেখতে হবে দেশটিকে।

তবে পরিস্থিতি আরো খারাপের আশঙ্কা রয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বী অন্য শীর্ষ অর্থনীতিগুলোর তুলনায় জাপানের পারফরম্যান্স কিছুটা ভালো। করোনা ভাইরাস প্রথম আঘাত হানে চীনে। প্রথম প্রান্তিকে দেশটির অর্থনীতি ৯.৮ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপি বছরের প্রথম তিন মাসে ৪.৮ শতাংশ কমেছে।

চলতি প্রান্তিকটা আগের চেয়ে বেশি খারাপ যাবে জাপানের প্রতিদ্বন্দ্বী শীর্ষ অর্থনীতিগুলোর জন্যও। এসব দেশ ধীরে ধীরে বিধিনিষেধ শিথিলের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কার্যক্রম শুরুর চেষ্টা করলেও সেখানে গৃহস্থালি ব্যয় এখনো সীমিত রয়েছে। কেবল জরুরি প্রয়োজনীয় খাতেই মানুষ খরচ করছে। 

এছাড়া খাদের কিনারায় থাকা কোম্পানিগুলো পতন ঠেকাতে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মী নিয়োগ কমিয়ে দিয়েছে। ফলে লকডাউন শিথিল করে উৎপাদনমুখী কার্যক্রম শুরু করলেও প্রথম সারির অর্থনীতিগুলোকে চলতি প্রান্তিকে নেতিবাচক ফল দেখতে হতে পারে।

চলতি প্রান্তিকে জাপানের জিডিপির ২১ দশমিক ৫ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে বলে বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, যা ১৯৫৫ সালের পর সর্বোচ্চ। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার ক্ষেত্রে এ হার যথাক্রমে ৩০ ও ৪০ শতাংশ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

নরিনচাকিন রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অর্থনীতিবিদ তাকেশি মিনামি বলেছেন, ‘কোনো সন্দেহ নেই যে চলতি প্রান্তিকটা আরো বেশি খারাপ যাবে।’ এ সময় তিনি গত মাসে প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের জরুরি অবস্থা ঘোষণা ও কঠোর বিধিনিষেধ পরিপালনের বিষয়টি উল্লেখ করেন। 

তিনি বলেন, কোম্পানিগুলোকে তহবিল সংগ্রহের জন্য সংগ্রাম করতে হচ্ছে। ফলে চলতি প্রান্তিকে ব্যবসা খাতে বিনিয়োগে স্থবিরতা নেমে আসতে পারে। অনেক কর্মীই তাদের বেতন পাওয়া নিয়ে চিন্তিত।’

মূলত জাপানের ক্রেতারা দুটি কারণে ধাক্কা খেয়েছেন। করোনা ভাইরাসের প্রভাব ছাড়াও অতিরিক্ত কর বৃদ্ধির বিষয়টিও তাদের বেশ ভুগিয়েছে। গত অক্টোবরে পণ্য বিক্রির ওপর কর ১০ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়া হলে বিপাকে পড়েছেন ক্রেতারা। 

বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, এপ্রিল-জুন এই তিন মাসে জাপানের অর্থনীতি ২২ শতাংশ সংকুচিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এদিকে করোনা পরিস্থিতি সামাল দিতে জাপান সরকার এরই মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলার (১ লাখ ১০ হাজার কোটি ডলার) প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। যা দেশটির জিডিপির ২০ শতাংশের বেশি। 

জাপানের অর্থমন্ত্রী ইয়াসুতোশি নিশিমুরা গতকাল বলেছেন, ব্যবসা ও গৃহস্থালি খাতকে সহায়তার লক্ষ্যে সরকার বাজেট থেকে দ্বিতীয় দফায় প্রণোদনা বরাদ্দের পরিকল্পনা করছে। এ সময় তিনি দেশটির অর্থনৈতিক মন্দাবস্থা আরো ঘনীভূত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে সতর্ক করেন।

নমুরা সিকিউরিটিজের অর্থনীতিবিদ মাসাকি কুয়াহারা বলেছেন, ‘করোনা-উত্তর বিশ্ব আর করোনা-পূর্ব অবস্থায় ফিরে যাবে না। করোনার প্রকোপ বন্ধ হলে আমাদের অবশ্যই সংক্রামক রোগের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের কথা ভাবতে হবে। তবে আমাদের পরিকল্পনা শুধু এতেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। টেকসই পরিবর্তনের বিভিন্ন উপায় নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, এ অবস্থায় নীতিনির্ধারকদের কেবল তাদের অর্থনৈতিক কার্যক্রম পুনরায় শুরুর কথা ভাবলেই হবে না, করোনা-উত্তর সময়ে কোন কোন খাতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, তাও ঠিক করতে হবে।

ব্রেকিংনিউজ/এম

bnbd-ads