কলেজছাত্রের ‘সেলুন লাইব্রেরি’

নুরনবী সরকার, লালমনিরহাট
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, সোমবার
প্রকাশিত: ০৯:৫৭

কলেজছাত্রের ‘সেলুন লাইব্রেরি’

লালমনিরহাটে সেলুন লাইব্রেরিতে জ্ঞানচর্চার প্রসারে ব্যাপক ভূমিকা রাখছেন কলেজছাত্র জামাল হোসেন। তিনি নিয়মিত ৩০টি সেলুন লাইব্রেরি পরিচালনা করছেন। প্রতিটি সেলুন লাইব্রেরিতে প্রতি সপ্তাহে বিভিন্ন ধরনের ১০টি বই সরবরাহ করেন। বইয়ের পরিমাণ বাড়ানোর বিশাল চাহিদাও তৈরি হয়েছে। ওই কলেজেছাত্র ব্যক্তিগত আগ্রহ থেকে বিনামূল্যে এসব সেলুন লাইব্রেরিতে বই সরবরাহ ও পর্যবেক্ষণ করে থাকেন। তিনি সেলুন লাইব্রেরির পরিমাণ বাড়ানোর চেষ্টা করছেন কিন্তু আর্থিক সঙ্কটের কারণে বাধা পড়ে আছে।

সেলুন লাইব্রেরির উদ্যোক্তা কলেজছাত্র জামাল হোসেন লালমনিরহাট সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ও আদিতমারী উপজেলার টিপার বাজার গ্রামের কৃষক আব্দুস সাত্তারের ছেলে। 

লালমনিরহাট শহরের কলেজ রোডে সেলুনের মালিক নন্দ কুমার শীল বলেন, সেলুন লাইব্রেরি তার এবং গ্রাহকদের জন্য উপকারী ও ভাল একটি সফল পদক্ষেপ। এখন আমরা আমাদের অবসর সময়কে সঠিক কাজে লাগাচ্ছি। সেলুনে রাখা বই পড়ে সেলুনে আসা গ্রাহকরা তাদের অবসরকে জ্ঞানচর্চায় ব্যয় করছে।

জেলার আদিতমারী উপজেলার টিপার বাজার এলাকার একটি সেলুনের মালিক সুকুমার চন্দ্র শর্মা বলেন, তিনি তার সেলুনকে সেলুন লাইব্রেরিতে পরিণত করেছেন। সেলুনে রাখছেন কলেজছাত্র জামাল হোসেনের দেওয়া বই। তার সেলুনকে সেলুন লাইব্রেরিতে পরিণত করায় তিনি উপকৃত হচ্ছেন। আগে আমার দোকানের গ্রাহকরা ধূমপান করতেন তবে এখন তারা ধূমপান করেন না, কারণ তারা বই পড়তে সময় ব্যয় করেন। তিনিও কাজের অবসর সময়ে বই পড়ে সময় কাটান বলে জানান।

সেলুনে আসা গ্রাহক আদিতমারী উপজেলার হাজীগঞ্জ এলাকার ব্যবসায়ী নেহের আলী বলেন, সেুলন লাইব্রেরি মানুষের অবসর সময়কে কাজে লাগাতে অনুপ্রেরণা যোগাচ্ছে। বই পড়ে জ্ঞানার্জন করার সুযোগ করে দিচ্ছে সেলুন লাইব্রেরিগুলো। যারা এমন উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন তারা কেবল সমাজের মঙ্গল চান।

আদিতমারী উপজেলার ভাদাই গ্রামের স্কুল শিক্ষক নূর ইসলাম বলেন, সেলুন লাইব্রেরিতে অনেক ধরনের বই পাওয়া যাচ্ছে। আমরা উপকৃত হচ্ছি। সেলুনে গেলে একটু অপেক্ষা করতে হয় কিন্তু এখন এই অপেক্ষার সময়টুকু কাজে লাগানো হচ্ছে বই পড়ে।

টিপার বাজার গ্রামের কলেজছাত্র দেলোয়ার হোসেন জানান, শুরু থেকে তিনি এবং অন্যান্য বন্ধুরা জামালকে সেলুন লাইব্রেরি চালাতে সহায়তা করছেন। আমরা নিয়মিত আমাদের দশ-বারো ফিট টিনশেড রুমের গ্রন্থাগারে বই এবং সংবাদপত্র পড়তে আসি।

জামাল হোসেন বলেন, গোটা জেলার ৫ উপজেলায় কমপক্ষে ১০০টি সেলুন লাইব্রেরি পরিচালনা করার পরিকল্পনা রয়েছে। পর্যায়ক্রমে এটি বাস্তবায়ন করবো। টিউশন থেকে উপার্জন করা টাকা এবং বন্ধুদের সহায়তায় এসব সেলুন লাইব্রেরি পরিচালনা করছি। আমি দেখেছি লোকেরা সেলুনে এসে তাদের সময় অহেতুক কাটায় আবার অনেকে ধূমপান করে থাকেন। তাই আমি সেলুনকে সেলুন লাইব্রেরি হিসেবে গড়ে তোলোর উদ্দ্যোগ গ্রহণ করি যেখানে লোকেরা তাদের জ্ঞান চর্চার জন্য সুবিধা পাবে।  সেলুন লাইব্রেরিতে বইয়ের পরিমাণ আরো বাড়ানো হবে তবে আর্থিক সঙ্কটের কারণে তা দ্রুত করতে পারছি না।

লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার সারপুকুর ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রাম টিপার বাজারে জামাল হোসেন প্রতিষ্ঠিত করেন সারপুকুর যুব ফোরাম পাঠাগার। এটি গ্রামে জ্ঞানের আলো জ্বালিয়েছে। এখন এটি শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের বন্ধন কেন্দ্র হয়ে উঠেছে, এমনকি সাধারণ মানুষ তাদের জ্ঞান শক্তি সমৃদ্ধ করার জন্য বই পড়তে এই পাঠাগারে চলে আসেন। 

জামাল হোসেন ২০১৪ সালে বিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন গ্রন্থাগারটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যাত্রা শুরু হয়েছিল মাত্র দশটি বই দিয়ে, তবে এখন লাইব্রেরিতে সাড়ে ছয় হাজার বই রয়েছে। বিজ্ঞান এবং ইতিহাসের বই আছে। কৃষি এবং প্রযুক্তিগত বিষয়গুলি সম্পর্কিত বই রয়েছে। বইয়ের পাশাপাশি দুটি জাতীয় দৈনিক, একটি আঞ্চলিক দৈনিক এবং একটি চাকুরী সংক্রান্ত পত্রিকা এখানে রাখা হচ্ছে নিয়মিত।

ব্রেকিংনিউজ/এমএইচ

bnbd-ads