দুই মেয়রের ধাক্কাধাক্কিতে স্বপ্ন ওদের ধুলোয়

রাহাত হুসাইন
২০ জানুয়ারি ২০২১, বুধবার
প্রকাশিত: ১১:৫৯ আপডেট: ০১:৫৪

দুই মেয়রের ধাক্কাধাক্কিতে স্বপ্ন ওদের ধুলোয়
ছবিতে ভুক্তভোগী আয়েশা ও মাহিনুর

আয়েশা আক্তার। একজন গৃহিণী। ক্ষুদ্র সঞ্চয় আর টিউশনির টাকা দিয়ে রাজধানীর সুন্দরবন স্কোয়ারের মার্কেটের ৫তম তলায় দক্ষিণ সিটি করপোরেশন থেকে একটি দোকান কিনেছিলেন। তখন সিটি করপোরেশনের মেয়র ছিলেন সাঈদ খোকন। তার আমলে কেনা দোকানটি বর্তমান মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নুর তাপসের আমলে নকশা বহির্ভূতের অভিযোগে হয়ে যায় ‘অবৈধ’। একপর্যায়ে দোকানটি ভেঙে দেয় সিটি করপোরেশন। সুন্দরবন স্কোয়ার সুপারমার্কেট ৫ম তলার ১৪১ নম্বরের সেই দোকান কিনতে ও ব্যবসা দাঁড় করাতে নিজের গহনা পর্যন্ত বেচে দিয়েছিলেন আয়েশা আক্তার।

এই দোকানটি নিয়ে উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন ছিলো আয়েশা আক্তারের। তার সেই স্বপ্ন এখন ধুলোয় ধূসর। আয়েশা আক্তার ব্রেকিংনিউজকে জানান, সুন্দরবন স্কোয়ারের মার্কেটের ৫তম তলায় ১৪১ নম্বর দোকানটি তার। একটি সোর্সের মাধ্যমে খবর পেয়ে তিনি দোকানটি ক্রয় করেন। 

তিনি বলেন, ‘আমার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয়, টিউশনির টাকা দিয়ে একটা দোকান নেয়ার চেষ্টা করি। এ ক্ষেত্রে আমার পরিবারও হেল্প করেছে। কেনার সময় কাগজপত্র দেখে কিনেছি। সিটি করপোরেশনের বরাদ্দপত্র ছিলো। অঙ্গীকারপত্র ছিলো, দোকানের ভাড়া নেয়া আছে, খাজনা দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছিলো এগুলো সব বৈধ দোকান। একবার কেনার পরে, দোকানে তালা দিয়ে আবারও ৬ লাখ টাকা নেয়। আমরা গায়ের জোরে এ দোকানগুলো কিনি নাই। আমরা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের টাকা দিয়ে এগুলো কিনেছি। পরবর্তীতে যখন দ্বিতীয়বার আমাদের ওপর ধাক্কা আসলো, দোকান তালা দিয়ে দেবে বলা হলো; তখন আমাদের গহনা বিক্রি করে দিই।’ 

আক্ষেপ করে আশেয়া আক্তার ব্রেকিংনিউজকে আরও বলেন, ‘আমাদের এই দোকানগুলো যদি অবৈধ হয়ে থাকে তাহলে আমরা সরকারি কাগজপত্রগুলো পেলাম কীভাবে? এগুলো তো সরকারি কাগজ। এই কাগজগুলোতে তো ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন লেখাই আছে। আমাদের দোকান যদি অবৈধ হয়ে থাকে তাহলে এই কাগজপত্রও অবৈধ হয়ে যায়।’ 

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও মেয়র ব্যরিস্টার শেখ ফজলে নুর তাপসের কাছেও আবেদন জানান আয়েশা আক্তার। বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও মেয়র মহোদয়ের নিকট আমাদের আবেদন থাকবে, এই বিষয়গুলো নিয়ে একটা জরুরি পদক্ষেপ নেয়া হোক। যারা এগুলোর সঙ্গে জড়িত আগে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হোক, আমাদের ক্ষতি না করে। আর যদি দোকানগুলো বৈধ হয়ে থাকে তাহলে আমাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হোক বা আমাদের ক্ষতিপূরণটা দেয়া হোক।’

এই নারী ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী সবসময় নারী উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের উৎসাহ যুগিয়েছন। আমি প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার উৎসাহ পেয়ে, নারী উদ্যোক্তা হওয়ার চেষ্টা করেছি। দোকান ভেঙে দেয়ায় আমি এখন সর্বস্বান্ত।’

দীর্ঘ ১০ বছর প্রবাস জীবন কাটিয়ে দেশে ফেরেন জসিম। প্রবাস জীবনের জমানো টাকা দিয়ে সুন্দরবন স্কোয়ারের সুপার মার্কেটে দোকান কিনেছিলেন তিনি। সোহেল টেলিকম নামে দোকান ছিলো তার। সে দোকানও ভেঙে দিয়েছে সিটি করপোরেশন। জসিম ব্রেকিংনিউজকে বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের কাগজপত্র দেখেই দোকানটি কিনেছিলাম। আবার সেই সিটি করপোরেশনই আমাদের দোকানটি ভেঙে দিলো। দোকানটিতে ব্যবসা জমিয়ে ফেলেছিলাম। দোকান উচ্ছেদ করায় আমি এখন নিঃস্ব। এই দোকানের আয় দিয়েই আমার ও আমার কর্মচারীদের পরিবার চলতো।  আমাদের এখন পথে বসার অবস্থা। এদেশে রোহিঙ্গাদের মূল্য রয়েছে, আমরা দেশের নাগরিক, আমাদের মূল্য নেই। সরকারের কাছে আবেদন, আমাদের পুনর্বাসন দেয়া হোক।’ 

জসিম কিংবা আয়েশা আক্তারের মতই ক্ষতিগ্রস্ত দোকানি মাহিনুর আক্তারও। নকশা বহির্ভূতের অভিযোগে তার দোকানটিও ভেঙে দিয়েছে সিটি করপোরেশন। তারা তিন বোন। তিন বোনের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে দোকানটি কিনেছিলেন তাদের বাবা। মাহিনুর আক্তার ব্রেকিংনিউজকে বলেন, ‘বাবা ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর, আমাদের তিন বোনের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে দোকানটি কিনেছিলেন। দোকানটি সুন্দরবন স্কোয়ারের সুপার মার্কেটের ৫ম তলায় ছিলো। দোকান নম্বর হলো ২৪৯। কেনার সময় আমাদের জমিটুকুও বিক্রি করে দিতে হয়।’

মাহিনুর আক্তার বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের বৈধতার কাগজপত্র দেখেই আব্বা দোকানটি কিনেছিলেন। এরপর আরেকবার বৈধতার কথা বলে ৬ লাখ টাকা নিয়েছে। তখনও আমরা তিন বোন নিজেদের গহনাপত্র বিক্রি করে টাকা দিয়েছি। এখন ‘অবৈধ’ অভিযোগে দোকান ভেঙে দিয়েছে সিটি করপোরেশন। পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে দোকান ‘অবৈধ’ বলে উচ্ছেদ করেছে, এখন আমরা কী করবো? কোথায় যাবো? কীভাবে চলবো?’

ব্রেকিংনিউজ/আরএইচ/এমআর

bnbd-ads