নগরবাসী ঘুমালে জেগে ওঠে ‘কারওয়ান বাজার’

তৌহিদুজ্জামান তন্ময়
১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, বৃহস্পতিবার
প্রকাশিত: ১২:২৮ আপডেট: ০৩:০১

নগরবাসী ঘুমালে জেগে ওঠে ‘কারওয়ান বাজার’
ছবি: সালেকুজ্জামান রাজীব

দিনভর ছুটে চলা ব্যস্ত নগরী ঢাকা রাতে ঘুমিয়ে পড়ে। রাত গভীর হলে ঢাকার বুকে নামে সুনসান নীরবতা। এটাই স্বাভাবিক। দিনের কোলাহল শেষে রাত যত বাড়ে, তত বাড়ে নীরবতা। তবে রাজধানীর সর্ববৃহৎ পাইকারি বাজার কারওয়ান বাজারে রাতের চিত্র বিপরীত। সেখানে দিনের কর্মব্যস্ততা শেষে ভিন্ন এক কোলাহল পুঞ্জীভূত হয় রাতে। রাতের কাওরান বাজার অন্য এক রূপ ধারণ করে।

রাত ১০টার পর থেকে আড়তগুলোতে জ্বলতে শুরু করে হালকা থেকে ভারি ভারি লাইট। মহাজন আসার আগে শুরু হয় আড়ত পরিষ্কারের কাজ। অনেকেই জ্বালান ধুপকাঠি। বাড়তে থাকে রাত। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে ব্যস্ততা। সবজিবোঝাই শাক-সবজি আর ফলমূলের ট্রাক এসে ভিড়ে মহাসড়ক ঘেঁষে। ভ্যানগুলো ঘিরে ধরে ওইসব ট্রাককে। মাল নামানো হয় ভ্যানে। তারপর ভ্যানগুলো বাজারের ভেতরে যার যার নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে। একেকটি ভ্যান সাধারণত পেয়ে থাকেন ছোট বস্তার জন্য ১৫-২০ টাকা। বড় বস্তার জন্য ৩০-৫০ টাকা। দূরত্বভেদে এই মূল্য কমবেশিও হয়ে থাকে। সবজি-ফল, চাল ইত্যাদি বহনকারী ট্রাকগুলো নামে পেট্রোবাংলা বিল্ডিংয়ের গলিগুলোতে। আর মাছ বহনকারী ট্রাকগুলো পণ্য নামায় এফডিসি রেলক্রসিংয়ের গলিতে।

মালবোঝাই একেকটা ট্রাক আসে আর তার পিছু পিছু ছোটে ভ্যানগাড়ি, শ্রমিক আর পথশিশুরা। ট্রাকটি ঘিরে তখন হল্লা ওঠে।
 
এই কারওয়ান বাজারই আবার দিনের বেলায় কেতাদুরস্ত। পার্কিংয়ে ও সড়কে চকচকে দামি গাড়ি, এলাকাজুড়ে সরকারি-বেসরকারি নানা অফিস-ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের স্যুটেড-বুটেড লোকজন আর সংবাদকর্মীদের আনাগোনা।
 
মূলত সন্ধ্যা মিলিয়ে রাত নামার পর বদলাতে থাকে দৃশ্যপট। মাথায় কিংবা কোমরে গামছা বাঁধা মানুষ দখল নিতে থাকেন এলাকার। সড়ক আর পার্কিংয়ে তখন এলোমেলো দাঁড়ানো ট্রাক। সারি সারি রিকশাভ্যান। এসব রিকশাভ্যানে আবার ব্রেক নেই। এগুলো শুধু মাল টানার কাজে ব্যবহার হয় কারওয়ান বাজারে।

সড়কবাতির আলো-আঁধারিতে হাজারো রাতজাগা মানুষের ব্যস্ততায় এক অদ্ভুত পরিবেশের সৃষ্টি হয় কারওয়ান বাজারের প্রায়ান্ধকার সড়ক আর অলি-গলিতে। এর মধ্যেই লেনদেন হয় লাখ লাখ টাকার।

পাইকারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ট্রাকে করে যেসব সবজি আসে তা কখনো সরাসরি আড়তে দেয়া হয়। আবার কখনো মধ্যস্বত্বভোগীরা পুরো ট্রাকের পণ্য কিনে পরে তা আড়তে বিক্রি করে কিংবা রাস্তার এক পাশে স্তূপ করে পাইকারি ক্রেতার জন্য। আড়ত থেকেও কেনে রাজধানীর বিভিন্ন কাঁচাবাজারের খুচরা ব্যবসায়ীরা। এই হাতবদল চলে রাতভর।

ট্রাক থেকে সবজি কিংবা ফল নামানো, আড়তে নেয়া, আবার আড়ত থেকে ভ্যানে-পিকআপে পণ্য তোলার ব্যস্ততা লেগে থাকে সকাল পর‌্যন্ত। কেউ মাথায় সবজিবোঝাই ঝুড়ি নিয়ে হন্তদন্ত ছুটে চলে, কেউ পিঠে বিশাল বস্তা বয়ে নিচ্ছে। ট্রাকের পেছনে রিকশাভ্যান লাগিয়ে তাতে স্তূপ করা হচ্ছে মালামাল।

এর মধ্যেই পড়ে যাওয়া শাক-সবজি কিংবা ফল টুকিয়ে নিচ্ছে একদল শিশু ও পুরুষ-মহিলা। এগুলোর জন্য তাদের দাম দিতে হয় না। রাতভর এভাবে কুড়ানো পণ্য একত্র করে তারা নির্ধারিত ক্রেতার কাছে কিংবা দিনের বেলায় বিক্রি করে সাধারণ মানুষের কাছে।

বিচিত্র কর্মযজ্ঞের ভিড়ে বেশি চোখে পড়ে মূলত শ্রমিকদের দৌড়ঝাঁপ। তারা অনেকে দলবদ্ধ হয়ে কাজ করেন। সবজি ভরা বিশাল বিশাল ঝাঁকা কিংবা বস্তা একের পর এক নামিয়ে দেখতে দেখতে খালি করে ফেলেন ট্রাক।

কারওয়ান বাজারে জাকির হোসেন নামের এক শ্রমিকের সঙ্গে কথা হয়। তিনি ব্রেকিংনিউজকে বলেন, এখানে কাম করি অনেক দিন। রাইত দশটায় আহি। সকাল পর্যন্ত থাকি। কাম শেষ কইরা যাইয়া ঘুমাই। ডিইলি চাইর-পাচ শ টাকা থাকে।

তবে তাদের আয় আরও বেশি হতো বলে জানান জাকির। বলেন, আগে লেবার কম ছিল, কাম বেশি ছিল, টাকাও ভালো পাইতাম। এহন অনেক লোক। আমার আবার বান্ধা পাইকার আছে। হের যত মাল আহে, আমরা কয়জন আছি, নিজেরা নামাই।

রাত আড়াইটার পর থেকে দেখা মিলবে আরও এক ধরনের রিকশাভ্যানের। ফজরের আগ পর্যন্ত আসে এসব ভ্যানগাড়ি। তারা মূলত রাজধানীর বিভিন্ন মহল্লায় ফেরি করে সবজি বিক্রি করে। রাতে কারওয়ান বাজার থেকে পাইকারি দরে সবজি কিনে নিয়ে যান তারা।

এছাড়া ঢাকার বিভিন্ন খুচরা বাজারে দৈনন্দিনের সবজি নেয়া হয় এখান থেকে। পাইকারি দামে শাক-সবজি কিংবা ফল চাইলে এ সময় কেনা যাবে পাইকারি দামে। তবে, এখান থেকে কেনাকাটার বিষয়ে বাড়তি সতর্কতার কথা জানান এখানকার নিয়মিত পাইকারি ক্রেতা পল্লব সেন।

ব্রেকিংনিউজকে পল্লব বলেন, খুচরা দোকান থেকে এক কেজি, আধা কেজি কেনা যায়। এখানে সেই সুযোগ নাই। পাল্লা দরে বিক্রি হয়। পাঁচ কেজির পাল্লা। অনেক সময় পাল্লায় আধা কেজি ঘাটতি থাকে। আবার একেক পাইকারের কাছে একেক দাম। দু-এক জায়গায় যাচাই না করে কিনলে নির্ঘাত ঠকতে হবে।
 
জানা গেছে, রাতের কয়েক ঘণ্টার ব্যবসায় তিন থেকে চার হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করেন একেকজন আড়তদার।
 
জমজমাট পাইকারি সবজি বেচাকেনার ভিড়ে ফুটপাতে ও সড়কের কিনারে বসে পরাটা-ডাল-ডিমভাজির অস্থায়ী দোকান। তবে রাতের কারওয়ান বাজারের অন্যতম আকর্ষণ গরুর বটভুনা। 

ব্রেকিংনিউজ/টিটি/এমআর

bnbd-ads