রবীন্দ্রনাথ ও নারীমুক্তি ভাবনা

ফেরদৌসী হক
৮ মার্চ ২০২০, রবিবার
প্রকাশিত: ১০:৩২ আপডেট: ১২:৩৫

রবীন্দ্রনাথ ও নারীমুক্তি ভাবনা

বিশ্ব সংস্কৃতির সুদীর্ঘ ধারায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক বিস্ময়কর প্রতিভা। নারী-জাগরণ সম্পর্কে তার নিজস্ব মতবাদ রবীন্দ্র-উপন্যাসবলীর মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে। রবীন্দ্র সৃষ্ট নারীদের দৃঢ় ব্যক্তিত্ব ও মনুষ্যত্ব এখনও অনুকরণীয়। তাই রবীন্দ্র-উপন্যাসে নারীর এ স্বরূপ উন্মোচনের সূত্র ধরেই উনিশ এবং বিশ শতকের বাঙালি সমাজ-সাহিত্যে নারী-চিত্রায়ন, সমাজদৃষ্টি ও শিল্প-মনস্তত্ত্বের স্বরূপ বিশ্লেষণ সম্ভব। যদিও আমাদের প্রাণ পুরুষ রবীন্দ্রনাথ তার দীর্ঘ জীবনের অনেকটা সময় জুড়েই নারী-স্বাধীনতা বা নারীমুক্তি বিষয়ে দ্বিধা মুক্ত ছিলেন না। তা সত্ত্বেও তিনি ভারতের সনাতন ঐতিহ্যকে অবজ্ঞা না করেও নারীর ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের মহত্ত্বকে স্বীকার করেছেন। এক্ষেত্রে অনবদ্যভাবে এ দুইয়ের সমন্বয় ঘটিয়েছেন তিনি।

উনিশ শতকের শেষের দিকে ‘করুণা’ রচনার মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস রচনার শুরু। ‘ভারতী’ পত্রিকায় ১২৮৪-১২৮৫ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত এ উপন্যাসটি ২৭ পরিচ্ছেদ পর্যন্ত লেখা হয়। ‘করুণা’ রচনার সময় রবীন্দ্রনাথের বয়স ছিল ষোল বছর। উনিশ শতকের রেনেসাঁসের ফলে নর-নারীর মধ্যে যে চেতনার ব্যবধান ঘটেছিল, তারই বহিঃপ্রকাশ এ উপন্যাস। এ শতকের সংস্কার-আন্দোলনের সঙ্গে চিরাচরিত প্রথার বিরোধ ছিল এ উপন্যাসগুলোর মূল বিষয়। ‘করুণা’ উপন্যাসেও এ দ্বন্দ্বকে রবীন্দ্রনাথ তুলে ধরেছেন। সেইসঙ্গে নারীমুক্তি সম্পর্কিত কিছু প্রশ্ন তিনি ‘করুণা’ চরিত্রের মধ্য দিয়ে পাঠকের কাছে রেখেছেন। যেমন, প্রকৃত শিক্ষায় বঞ্চিত থাকার জন্য নারীর ব্যক্তিত্বের অভাব, বাবার সম্পত্তিতে কন্যাসন্তানের অনধিকার এবং অপরিণত রানীর বাল্যবিবাহের ফলে স্বামীর সঙ্গে যে দুস্তর মানসিক ব্যবধান, তা রবীন্দ্রনাথ তুলে ধরেছেন এ উপন্যাস ভাবনায়। এ উপন্যাসে নারীর অপরিণত ব্যক্তিত্বের কারণ অনুসন্ধান করেছেন রবীন্দ্রনাথ।

‘বউঠাকুরানীর হাট’ ইংরেজি ১৮৮৩ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথের প্রথম পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস। ইতিহাসের প্রেক্ষপটে পুরুষ-প্রাধান্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত গার্হস্থ্য জীবন চিত্রিত হয়েছে এ উপন্যাসে। এতে একদিকে তিনি প্রতাপাদিত্যের জীবনের মধ্য দিয়ে দেখিয়েছেন আধিপত্যবাদকে, অন্যদিকে দেখাতে চেয়েছেন পারিবারিক এই আধিপত্যবাদে কীভাবে নিষ্পেষিত হয় সুরমা, বিভা, উদয়াদিত্য, বসন্ত রায়ের মতো সংবেদনশীল ব্যক্তিমানবেরা। রাজা প্রতাপাদিত্যের প্রবল প্রতাপ ও হৃদয়হীন ক্ষমতার প্রকাশে পুরুষপ্রধান সমাজে নারীরা কিভাবে সামাজিকভাবে দ্বীপান্তরে নির্বাসিত হয়, তা দেখানো হয়েছে। ধারণা করা হয়ে থাকে, রবীন্দ্রনাথের পরবর্তী নারীভাবনার বীজ-এ উপন্যাসের পাওয়া যায়।

‘রাজর্ষী’ উপন্যাস ১৮৮৭ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। এ সময় কবি চেতনায় চলছে সবরকম তুচ্ছতা থেকে উত্তরণের আকাক্সক্ষা। সীমা থেকে অসীম, অপ্রেম থেকে প্রেমে উত্তরণের জন্য তার চিত্ত তখন উন্মুখ। এ উপন্যাসে বলিপ্রথা নিবারণের জন্য রাজা গোবিন্দ্যমাণিক্যের যে দৃঢ় প্রচেষ্টা তার পশ্চাতেও কাজ করেছে সবরকম অমানবিকতা থেকে মানুষকে মুক্ত করার ইচ্ছা। এ দৃঢ় প্রচেষ্টাই রবীন্দ্রনাথের পরবর্তী নারীমুক্তি- সম্পর্কিত ভাবনার ভিত্তি। রবীন্দ্র ভাবনায় স্ত্রীস্বাধীনতা বা নারীমুক্তি মানবিকতারই অপর নাম।

১৩০৯ বঙ্গাব্দে ‘চোখের বালি’ গ্রন্থাকারে প্রকাশ পায়। তীক্ষè বিশ্লেষণ এবং সেইসঙ্গে সহমর্মিতার মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ এ উপন্যাসে চরিত্রদের বিশ্লেষণ করেছেন। বিনোদিনী, আশা, রাজলক্ষ্মী ও অন্নপূর্ণা- এই চারজন পৃথক ব্যক্তিত্বের নারীকে তিনি পৃথক দৃষ্টিকোণ থেকে এবং তাদের অন্তঃশায়ী সুপ্ত চেতনাকে ঘটনার মধ্য দিয়ে টেনে বের করতে চেয়েছেন। রেনেসাঁসের ফলে ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের যে ঢেউ সমাজকে উদ্বেল করে তুলেছিল, যা নাড়া দিয়েছিল সমাজের মূল ভিত্তি পরিবারকে, তারই স্বাক্ষর ‘চোখের বালি’ উপন্যাস। নারী শিক্ষা, তার উত্তরাধিকারের দাবি, বিধবা নারীর পুনর্বিবাহ, এমনকি সধবা নারীর প্রেমের স্বাধীনতা- এসবকিছুই ব্যক্তি-নারীর স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের স্বীকৃতির উপাদান। এবং তারও অনেক গভীরে প্রথোতি নারীর আত্মাভিমানের শেকড়- যার স্বীকৃতির প্রতীক্ষায় রবীন্দ্রনাথের নারীরা।

১৯১৬-তে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত ‘চতুরঙ্গ’ উপন্যাসের প্রধান চরিত্র শচীশ, দামিনী ও শ্রীবিলাস। রবীন্দ্রনাথ ডায়েরি লেখার আঙ্গিকে শ্রীবিলাসের জবানিতে উপন্যাসটি লিখেছেন। ‘চোখের বালি’র বিনোদিনীর পথেই দামিনীর আবির্ভাব। একচোখে জল আর অপর চোখে আগুন নিয়ে জীবনের বন্ধুর পথে দামিনীর যাত্রা। একদিকে সামাজিক একদেশদর্শিতা যা দামিনী নিজস্ব তেজে পুড়িয়ে ছারখার করে দিতে চেয়েছে, অন্যদিকে একান্ত নিজস্ব চাওয়া নিয়ে সৃষ্টি করতে চেয়েছে তার একান্ত নিজস্ব জগৎ। বিধবা নারীর প্রেম ও তার দৈহিক আকাক্সক্ষার স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ দামিনীকে রক্তমাংসের মানবী করে তুলেছেন।

একই বছর গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় তার ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাস। এ উপন্যাসের প্রধান তিন চরিত্র- নিখিলেশ, সন্দীপ ও বিমলা। এ উপন্যাসেও রবীন্দ্রনাথ ডায়েরি লেখার আঙ্গিকে অন্তঃপুরবাসিনী নারীর আত্ম-আবিষ্কারের গল্প বলেন। নিখিলেশ তার স্ত্রী বিমলাকে অন্তঃপুরের বদ্ধ আবহাওয়া থেকে বাইরে এনে দেখতে চেয়েছিল, অন্য পুরুষদের মধ্যে সে বিমলার কাছে কতটুকু গ্রহণযোগ্য। এবং তাদের পারস্পারিক প্রেমের ভিত্তি কতখানি দৃঢ়। বিমলা তার আত্মদর্পণে নিজেকে যেমন সত্যভাবে উপলব্ধি করেছে, তেমনি উপলব্ধি করেছে নিজস্ব দুর্বলতা ও শক্তিকে।

‘যোগাযোগ’ উপন্যাসের প্রধান নারীচরিত্র কুমুদিনীর মধ্য দিয়ে সমাজে নারীর অস্তিত্বের সংকটকে নিপুনভাবে তুলে ধরেছেন রবীন্দ্রনাথ। মধুসূদন ও কুমুদিনীর দাম্পত্য সমস্যাকে কেন্দ্র করে রবীন্দ্রনাথ বিবাহ প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত নতুন চিন্তা তুলে ধরেছেন, যার ভিত্তি দুই একই পথযাত্রীর মূল্যবোধ ও চেতনার পার্থক্য।

১৯২৯ সালে প্রকাশিত ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ নারীপুরুষের প্রেমসম্পর্কিত ভাবনাকে আপাত রোমান্টিকতার আবরণে বাস্তব রুপ দিতে চেয়েছেন। লাবণ্যের মধ্য দিয়ে তিনি দেখাতে চেয়েছেন যে, সচেতন নারী প্রেয় থেকে শ্রেয়র পথে যাত্রা করে। প্রেমকে তিনি জীবনের চালিকাশক্তিরুপে দেখিয়েছেন। এবং দেখাতে চেয়েছেন যে বিবাহ-প্রতিষ্ঠানে সেই মুক্তপ্রেমের মৃত্যু ঘটে। লাবন্য সেই মুক্তপ্রেমের আলোকে কর্মসাধনার পথে যাত্রা করেছে।

নারীমুক্তি সম্পর্কিত ভাবনা রবীন্দ্রনাথকে ‘করুণা’ থেকে শুরু করে ‘এলা’তে এনে দাঁড় করিয়েছে। তার সৃষ্ট নারী চরিত্রের মধ্যে নারী যেমন আত্মআবিষ্কার করেছে, তেমনি পুরুষও সেই দর্পণে নিজেদের প্রতিবিম্ব দেখে চমকে উঠেছে। এভাবেই রবীন্দ্রনাথের নারীরা প্রভাবিত করেছে সময়, সমাজ ও ব্যক্তিকে।

ব্রেকিংনিউজ/এমআর

bnbd-ads