মানিকগঞ্জে মধু সংগ্রহে ব্যস্ত মৌ চাষিরা

শাহজাহান বিশ্বাস, মানিকগঞ্জ
১ ফেব্রুয়ারি ২০২০, শনিবার
প্রকাশিত: ০২:৪৪ আপডেট: ০২:১২

মানিকগঞ্জে মধু সংগ্রহে ব্যস্ত মৌ চাষিরা

মানিকগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় সরিষার ফুল থেকে মধু সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে মৌ চাষিরা। মৌ চাষিদের সগৃহীত মধু রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আনা সম্ভব। তবে সরকারি সহযোগিতার অভাবে হতাশায় ভুগছেন এসব মৌ চাষিরা। 

সরেজমিনে দেখা যায়, জেলার বিভিন্ন এলাকায় সরিষা চাষ বৃদ্ধির সাথে সাথে মৌ চাষিদের সংখ্যাও বাড়ছে। সরিষার হলুদ রংয়ের ফুলে ভরে উঠেছে দিগন্ত জুড়া মাঠ। হুলুদ ফুলে ভরা এ সরিষা মাঠকে ঘিরে বিভিন্ন জেলা থেকে আসা মৌ চাষিরা ব্যস্ত মধু সংগ্রহে।
  
মানিকগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা চাষিদের সাঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এবার কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরা নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রায় অর্ধশত মৌ চাষির দল মানিকগঞ্জে মধু সংগ্রহ করছেন। তাদের সংগ্রীত মধু ঢাকা চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চেলে বিক্রি করছে তাদের সংগৃহিত মধু। এতে একদিকে দেশের বেকার সমস্যা দূর হচ্ছে অপরদিকে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা ফিরে আসছে।

চাষিরা বলেন, প্রতি বছর নভেম্বর থেকে শুরু করে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলে সরিষার ফুল থেকে মধু সংগ্রহ। আবহাওয়া ভাল থাকলে এ সময় একেক জন চাষী প্রতি সপ্তাহে প্রায় ১০ থেকে ১২ মণ মধু সংগ্রহ করতে পারে। এতে দেখা যায় একজন চাষি সরিষার এ মৌসুমে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ মণ মধু সংগ্রহ করে। পাইকারি দরে যার মূল্য প্রায় ৫ লাখ টাকা।

সাতক্ষীরা থেকে আসা চাষি সিরাজুল ইসলাম জানান, মৌ চাষের মাধ্যেমে সরিষা, ধনিয়া, কালো জিরা, গুজিতিলসহ বিভিন্ন প্রকার রবি ফসলের ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করা হয়। এভাবে বছরে ৭ মাস বিপুল পরিমাণ মধু সংগ্রহ করা যায়। 

প্রচুর পরিমাণ মধু সংগ্রহ করলেও নেয্য মূল্য পাচ্ছেন না অভিযোগ অধিকাংশ চাষিদের। তারা বলেন, ‘দেশে বর্তমানে প্রচুর পরিমাণে মৌ চাষের মাধ্যমে মধু সংগ্রহ হচ্ছে। কিন্তু চাষিরা মধু বিক্রির ভাল কোন ক্ষেত্র না পাওয়ায় মুষ্টিমেয় সিন্ডিকেটকৃত কিছু ব্যবসায়ীদের নিকট কমদামে মধু বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে মধুর ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তারা।’

‘সরকার যদি চিংড়ি মাছ রপ্তানির মতো বিদেশে মধু রফতানির ব্যবস্থা করতো তাহলে মৌ চাষি ও ব্যাবসায়ীসহ সবাই লাভবান হতো। দেশে প্রচুর পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন হতো বলেও জানান তারা।’ 

মৌ চাষি সিরাজুল ইসলাম জানান, বিগত ১২ বছর ধরে মৌচাষ করে মধু সংগ্রহের কাজ করছেন। প্রথমে তিনি অন্যের সঙ্গে তিন বছর কাজ করে এ ব্যবসা সম্পের্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। এরপর বিসিক থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রথমে ২০ টি বাক্সের মাধ্যমে ৬০ হাজার টাকা পুঁজি খাটিয়ে ২০০৮ সাল থেকে মৌ চাষের মাধ্যমে মধু সংগ্রহের কাজ শুরু করেন। বর্তমানে তার ১৩০টি বাক্স দিয়ে মৌ চাষের মাধ্যমে মধূ সংগ্রহ করছেন। যার প্রতিটি বাক্স থেকে প্রতি সপ্তাহে ৮ থেকে ১০ কেজি করে মধু পাওয়া যায়। এভাবে তিনি প্রতি মাসে ১৩০টি বাক্স থেকে প্রায় ৩২ মন মধু সংগ্রহ করছেন। যার মূল্য প্রায় ১লাখ ৯২হাজার টাকা। 

তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন মৌসুমে মানিকগঞ্জ, পাবনা, গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, টাঙ্গাইলসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে মধূ সংগ্রহ করে থাকি। বিশেষ করে ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে মানিকগঞ্জের সরিষার ফুল থেকে, ফ্রেব্রয়ারি, মার্চ শরীয়তপুর গোপালগঞ্জের ধনিয়া কালিজিরা ও গুজি তিলের ফুল থেকে এপ্রিল-মে দিনাজপুরের লিচুর ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করি। সবশেষে সুন্দর বন। এসব মধু ঢাকা চট্রগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হয়।’ 

নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা নিউ ইশাখাঁ মৌ খামারের মালিক মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, ২০০৪ সালে বিসিক থেকে ট্রেনিং নিয়ে ১লাখ ২০হাজার টাকা পুঁজি খাটিয়ে ২০টি বাক্স নিয়ে মধু সংগ্রহের কাজ শুরু করেন। বর্তমানে তার বাক্স সংখ্যা ১৯০টি। সরিষার ফুল থেকে প্রতি সপ্তাহে তিনি ৬ থকে ৭ মণ করে মধু সংগ্রহ করছেন। সংগৃহীত এসব মধু এপি কোম্পানিসহ ঢাকার যাত্রাবাড়ী, গুলিস্থান, গাজিপুর ও নোয়াখালীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাইকারী দোকানে সরবরাহ করে থকেন। আমদের দেশে প্রায় ৩ হাজার মৌ-খামারী রয়েছে। এরা ৭ মাসে প্রায় ৩০ হাজার টন মধু সংগ্রহ করে থাকে। এসব মধু বাজারজাত করার জন্য ভাল কোন ক্ষেত্র না থাকায় প্রকৃত মূল্য পাচ্ছেনা খামারীরা। 

তিনি আরও জানান, মহাজনদের সিন্ডিকেটের কারণে মধুর ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা। মহাজনরা তাদের কাছ থেকে কমমূল্যে মধু ক্রয় করে তিন চার গুন বেশী মূল্যে বিক্রি করছে। অনেক সময় বাকীতে মহাজনদের মধু দিয়ে টাকা পয়সা উঠানো কষ্টকর হয়ে পড়ে।

এছাড়া মৌ মাছিসহ বাক্স নিয়ে এক স্থান থেকে অন্যস্থানে যেতে নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয়। যেমন ফেরী ঘাটে গিয়ে ফেরী পারাপারের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। রাস্তায় পুলিশরা গাড়ি আটকিয়ে তল্লাসির নামে হয়রানি করে। এতে অনেক মৌমাছি মাড়া যায়। এব্যাপারে সরকার দৃষ্টি রাখলে আমাদের দেশের চাহিদা মিটিয়ে মধু বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হতো বলেও  জানান তিনি।

ব্রেকিংনিউজ/এসপি

bnbd-ads